বিতর্কিত বিচারপতি খায়রুল হকের কারামুক্তিতে বাধা নেই

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালীন হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের এক মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার রুলসহ এই জামিন আদেশ দেন।

আদালতের এই আদেশের ফলে খায়রুল হকের কারামুক্তিতে আইনগত আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন।

আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, ঢাকার বনানী থানায় দায়ের করা এই মামলায় গত ২৭ জুলাই বিচারক (অধস্তন) আদালতে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর রোববার (৯ আগস্ট) হাইকোর্টে জামিনের আরজি জানান তিনি। গতকাল হাইকোর্টের কার্যতালিকায় আবেদনটি ৩৭২ নম্বর ক্রমিকে শুনানির জন্য ওঠে।

আদালতে খায়রুল হকের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো: মনসুরুল হক চৌধুরী ও মোতাহার হোসেন সাজু এবং আইনজীবী মোনায়েম নবী শাহীন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন।

শুনানি শেষে অ্যাডভোকেট মোনায়েম নবী শাহীন সাংবাদিকদের জানান, মামলাটিতে কেন নিয়মিত জামিন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খায়রুল হককে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, সাবেক এ প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে মোট ৯টি মামলা রয়েছে। এর আগে আটটি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। সর্বশেষ এই নবম মামলাটিতে জামিন পাওয়ায় তার কারামুক্তির পথ সুগম হলো।

বনানী থানার মামলার এজাহার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে মহাখালী সেতু ভবনের সামনে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। সেখান থেকে শাহবাগের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তাদের ওপর হামলা, গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে উজ্জ্বল মিয়াসহ অন্তত ২৫-৩০ জন আহত হন। এই ঘটনায় উজ্জ্বল মিয়া বাদি হয়ে বনানী থানায় হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে মামলাটি দায়ের করেন। পরবর্তী সময়ে গত ২ জুলাই তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক প্রধান বিচারপতিকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর (শ্যোন গ্রেফতার) আবেদন করলে ৮ জুলাই আদালত তা মঞ্জুর করেন।

গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে খায়রুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ। প্রথমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হতে থাকে।

বারবার নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানোর এ প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৩ মে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন খায়রুল হকের ছেলে আইনজীবী আশিক উল হক। প্রাথমিক শুনানি শেষে ১৭ মে হাইকোর্ট সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে গ্রেফতার বা হয়রানি না করার নির্দেশ দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ও রুল জারি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করলেও গত রোববার আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন নিষ্পত্তি করে দেন এবং রুলটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। ফলে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া খায়রুল হককে নতুন করে গ্রেফতার বা হয়রানি না করার হাইকোর্টের নির্দেশনাটি বহাল থাকে।

উল্লেখ্য, এ বি এম খায়রুল হক ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের ১৭ মে পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০১১ সালের ১০ মে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন। প্রথমে সংক্ষিপ্ত রায় দিলেও অবসর গ্রহণের পর নজিরবিহীনভাবে তিনি মামলাটির পূর্ণাঙ্গ রায় দিয়েছিলেন। তার ক্ষমতা অপব্যবহারের কারণে দেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণতন্ত্র ধ্বংস করাসহ তিনি রীতিমতো রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে অবস্থান নিয়ে পদে পদে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এমনকি তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে অবসর নেয়ার পরও সীমাহীন লোভের কারণে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ বিষয়টি প্রধান বিচারপতির মর্যাদাকে ক্ষুণœ করেছে। এভাবে তিনি নেতিবাচক বহু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল ছাড়াও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে খায়রুল হকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানের নাম বাতিল, দুই বিতর্কিত বিচারপতিকে শপথ পড়ানো, খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, চিকিৎসার নামে ত্রাণ তহবিলের টাকা গ্রহণ, আগাম জামিনের এখতিয়ার কেড়ে নেয়া এবং জালিয়াতি ও ক্ষমতা অপব্যবহার করে রাজউকের প্লট গ্রহণ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

সিনিয়র আইনজীবী ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের কারণে আয়নাঘর তৈরি হয়েছিল। গণতন্ত্র ধ্বংস করে তিনি হাজার মানুষ হত্যার পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। খালেদা জিয়াকে শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বের করে দিয়েছিলেন এই খায়রুল হক। এ ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার বিনিময়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন।