বর্ষাকাল এলেই রাজধানী ঢাকায় পরিচিত দুর্ভোগ যেন নতুন করে ফিরে আসে। কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি তো দূরের কথা, মাঝারি বৃষ্টিতেই রাজধানীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা ও ব্যবসাকেন্দ্র ডুবে যায় হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানিতে। থমকে যায় যান চলাচল, স্থবির হয়ে পড়ে নগরজীবন। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ পথচারী-সবাইকে চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। প্রতি বর্ষায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি নগরবাসীর মনে একটাই প্রশ্ন জাগায় জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন বদলায় না ঢাকার চিত্র?
ঢাকা ওয়াসা এবং দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে অন্তত দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। নালা নির্মাণ ও সংস্কার, খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন, পাম্পিং স্টেশন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণে এই অর্থ খরচ করা হলেও বাস্তবে বর্ষা এলেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা এখনো পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা এবং অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
প্রতিশ্রুতি ছিল ১৫ মিনিটে পানি নামবে
২০১৭ সালে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ২০২৩ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ঘোষণা দিয়েছিলেন, অতিবৃষ্টি হলেও ১৫ মিনিটের মধ্যে রাজধানীর পানি নেমে যাবে এবং জলাবদ্ধতা থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকছে। কোথাও যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে, কোথাও দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে লাখ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। নাগরিকদের দুর্ভোগও বাড়তে থাকে।
জলজট নয়, এটি দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অল্প সময়ের জন্য পানি জমে দ্রুত নেমে গেলে সেটি জলজট। কিন্তু পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকা, একই এলাকায় বারবার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের পথ অকার্যকর হয়ে পড়াই জলাবদ্ধতা। তাদের মতে, ঢাকার বর্তমান সঙ্কট কোনো সাময়িক জলজট নয়; এটি বছরের পর বছর ধরে চলা অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল পরিকল্পনা এবং অব্যবস্থাপনার ফল।
সমস্যার মূল কোথায়?
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, সমস্যার মূলকারণ শুধু ড্রেনের অভাব নয়; পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। তার ভাষায়, ‘বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প নেয়া হচ্ছে, কিন্তু বৃষ্টির পানি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে নদীতে পড়বে, সেই আউটলেট সচল করা হচ্ছে না। শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার প্রধান কারণগুলো হলো- খাল ও জলাধার দখল এবং ভরাট, ড্রেন ও নালায় বর্জ্য ও পলি জমে যাওয়া, খাল, ড্রেন ও নদীর মধ্যে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ন, দীর্ঘমেয়াদি ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার অভাব এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি।
পানি নামার পথই অকার্যকর
ঢাকা উত্তর সিটিতে রয়েছে ২৯টি খাল এবং প্রায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার নালা। দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৬টি খাল এবং এক হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি নালা-নর্দমা। কাগজে-কলমে এই অবকাঠামো থাকলেও বাস্তবে অনেক খাল দখল, ভরাট ও দূষণের শিকার। কোথাও নালার মুখ বর্জ্যে আটকে গেছে, কোথাও কালভার্ট সঙ্কুচিত, আবার কোথাও খালের সাথে ড্রেনের সংযোগই বিচ্ছিন্ন। ফলে বৃষ্টির পানি নদীতে পৌঁছানোর আগেই নগরের ভেতরে আটকে যায়।
পাম্পিংস্টেশন থাকলেও মিলছে না সুফল
দক্ষিণ সিটির দোলাইপাড় ও টিটিপাড়া পাম্পস্টেশন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন হলেও অনেক সময় সেগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। কারণ পানি পাম্প পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন স্থানে ড্রেন ও খালের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল কর্মকর্তাদের মতে, নালা ও খালের মুখ বর্জ্য ও পলিতে বন্ধ হয়ে থাকায় পাম্পের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু কমছে না দুর্ভোগ
২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় করেছে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা, ঢাকা উত্তর সিটি ৭১১ কোটি টাকা এবং একই সময়ে ঢাকা ওয়াসা ব্যয় করেছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এরপর ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ওয়াসার কাছ থেকে পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব নেয়ার পর আরো প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে দুই সিটি করপোরেশন। সবমিলিয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৪৬ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু এত বিপুল ব্যয়ের পরও রাজধানীতে এখনো ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১০৮টি এবং দক্ষিণে ৩৩টি।
প্রয়োজন সমন্বিত মহাপরিকল্পনা
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক মো: আবদুস সালাম বলেন, অতীতের অনেক প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবতার মিল ছিল না। স্থায়ী সমাধানের জন্য পানি নিষ্কাশনের পথ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই মত দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরাও। তাদের মতে, খাল পুনরুদ্ধার, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, নদীর সাথে ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ, আধুনিক পাম্পিংব্যবস্থা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং একটি সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ছাড়া ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
প্রশ্ন রয়ে যায়
প্রতি বছর নতুন প্রকল্প, নতুন বরাদ্দ আর নতুন প্রতিশ্রুতির পরও রাজধানীর মানুষকে একই দুর্ভোগ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাই প্রশ্ন উঠছে- সমস্যা কি অর্থের অভাবে, নাকি পরিকল্পনা, সমন্বয় ও জবাবদিহির ঘাটতিতে? যতদিন না খাল-নদী-ড্রেনের স্বাভাবিক সংযোগ পুনঃস্থাপন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং বৈজ্ঞানিক নগর পরিকল্পনা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও বর্ষা এলেই রাজধানী ঢাকার ভাগ্যে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকেই যাবে।



