মুহা: জিল্লুর রহমান সাতক্ষীরা
এশিয়ার বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে শুরু হয়েছে মধু আহরণের ব্যস্ততম মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুমতিপত্র নিয়ে মৌয়ালরা দলবদ্ধভাবে বনের গভীরে প্রবেশ করছেন মধু সংগ্রহে।
জীবনের ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন বনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। প্রতিটি দলে থাকেন একজন অভিজ্ঞ ‘সর্দার’, যিনি বন সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং মৌচাক শনাক্তে পারদর্শী। গাছের ফুল, মৌমাছির উড়াউড়ি ও গন্ধ দেখে চাকের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এরপর ধোঁয়ার সাহায্যে মৌমাছি সরিয়ে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ করা হয় মধু। পুরো প্রক্রিয়াটি যেমন কৌশলনির্ভর, তেমনি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
মৌয়ালদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। প্রায়ই বাঘের আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিষধর সাপ, কুমির ও দুর্গম খাল-বিল তাদের পথকে আরো বিপজ্জনক করে তোলে। তবুও জীবিকার তাগিদে এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করে বনে প্রবেশ করেন তারা।
স্থানীয় মৌয়ালরা জানান, বছরের এই মৌসুমেই তাদের প্রধান আয় নির্ভর করে। অনেকেই ঋণ নিয়ে বনে যান, ভালো মধু সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে ঋণ শোধ ও সংসার চালানোর আশায়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যপ্রাণীর আক্রমণ কিংবা জলদস্যুর ভয়ে অনেক সময় তারা ক্ষতির মুখে পড়েন।
বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অনুমতিপত্র ছাড়া কাউকে বনে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি নির্ধারিত এলাকা ও সময় মেনে মধু আহরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না হয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ এপ্রিল থেকে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন এলাকা থেকে ২৪টি নৌকায় ১৬৭ জন মৌয়াল এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে মোট ৪৬টি পাসের মাধ্যমে ৩১২ জন মৌয়াল মধু আহরণে বনে প্রবেশ করেছেন।
এদিকে, স্থানীয় বাজারে সুন্দরবনের খাঁটি মধুর চাহিদা ইতোমধ্যে বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, মৌসুম ভালো গেলে সরবরাহও বাড়বে।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষ যুগের পর যুগ জীবনঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মধু আহরণ করে আসছেন। বাঘ, কুমির ও জলদস্যুর ঝুঁকির মধ্যে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়। তিনি বাঘের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে, সুন্দরবনের মৌয়ালদের এই কঠোর পরিশ্রম শুধু তাদের জীবিকার উৎস নয়, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।



