বিনিয়োগের বড় বাধা প্রক্রিয়াগত জটিলতা

ইআরএফ-এসএমই ফাউন্ডেশনে শিল্পমন্ত্রী

Printed Edition
রাজধানীতে ইআরএফ ও এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাজেট নিয়ে মতবিনিময় সভায় অতিথিরা : নয়া দিগন্ত
রাজধানীতে ইআরএফ ও এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বাজেট নিয়ে মতবিনিময় সভায় অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে গতি আনতে এসএমই খাতকে চাঙ্গা করা সরকারের অগ্রাধিকার। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো জটিলতা। এজন্য ব্যবসার শুরু থেকে পণ্য আমদানি বা রফতানি পর্যন্ত সময়কে ৩৫৫ দিন থেকে ১৪ দিনে নামিয়ে আনার পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরতিহীন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে চায় সরকার বলে জানিয়েছেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এসএমইর জিডিপিতে কন্ট্রিবিউশন শ্রীলঙ্কায় ৫২ শতাংশ, ক্যাম্বোডিয়ায় ৫৮ শতাংশ, ইন্ডিয়াতে ৪৫ শতাংশ, চীন, জাপান এবং সাউথ কোরিয়ায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। আমাদের এখানে অনেক কম ৪০ শতাংশের মতো।

রাজধানীর পল্টনের অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সহযোগিতায় এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : এসএমই খাতের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ মতবিনিময় সভায় বুধবার এসব কথা বলেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালার সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সদস্য ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন এবং স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের উপমহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ আলম। মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম।

মূল প্রবন্ধে মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য এসএমই খাতের উন্নয়নে এসএমই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত ১১৩টি প্রস্তাবের মধ্যে ৩৬টি প্রস্তাব সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে আয়কর সংক্রান্ত ১২টি, ভ্যাট সংক্রান্ত পাঁচটি এবং শুল্ক সংক্রান্ত ১৯টি প্রস্তাব বাজেটে গৃহীত হয়েছে। প্রথমবারের মতো বাজেটের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় এসএমই খাতের জন্য প্রায় সাত হাজার আট শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এসএমই ফাউন্ডেশন মনে করে, এসএমই খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার প্রণীত জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২, জাতীয় এসএমই নীতিমালা ২০২৬ (খসড়া), ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি ২০২৩ এবং রফতানি নীতিমালা ২০২৪-২০২৭-এ এসএমই খাতের জন্য বিভিন্ন কর ছাড় ও প্রণোদনার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে বাস্তবে এসব নীতিগত সুবিধা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তাই নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে কর ও শুল্ক সুবিধা কার্যকরভাবে প্রদান নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, সরকারের ‘একটি-গ্রাম-একটি-পণ্য’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি খাতের উন্নয়নে প্রাথমিকভাবে তিন শ’ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখান থেকে এসএমই ফাউন্ডেশেনর জন্য অন্তত এক শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করা যেতে পারে। এসএমই ফাউন্ডেশনের গবেষণা অনুযায়ী দেশের ১৭৭টি শিল্প ক্লাস্টারে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাই ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই উন্নয়নের বিকল্প নাই। এসএমই ক্লাস্টারের হলিস্টিক উন্নয়নের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশনের অনুকূলে বছরে অন্তত ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা যেতে পারে।

মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এসএমই এই বিকাশ বা ইকোনমির মধ্যে এত ওয়েল ডিভাইসড হওয়ার বেনিফিটটা হচ্ছে পারচেজিং পাওয়ার অনেক বেশি থাকে। ইকোনমির প্রত্যেকটা অংশের মধ্যে একটা প্রাণপ্রবাহ থাকে। তিনি বলেন, আমরা যেটাকে ক্লাসিফাই করি মাঝারি হিসেবে বা ক্ষুদ্র হিসেবে ডেফিনেটলি সেটা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বা সাউথ কোরিয়াতেও সেটা মাঝারি হবে না সেটা হবে অতি ক্ষুদ্র। কিন্তু তারপরও আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী বা আপনার ইকোনমির সাইজ অনুযায়ী আপনি গ্রেডিংটা করবেন। এটার ব্যক্তি যত বেশি থাকবে যত ছড়ানো থাকবে ইকোনমির মধ্যে ব্লাড সার্কুলেশন তত স্ট্রং থাকবে।

সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার একই সাথে একটি গ্রাম একটি পণ্য উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং ন্যাশনাল পুল অব ডিজাইনারস গঠনের মাধ্যমে দেশীয় হস্তশিল্পের মান উন্নয়ন ও বাজার সম্প্রসারণে কাজ করছে। আমাদের এই বাজেটের লক্ষ্য বা অর্থমন্ত্রীর লক্ষ্য হচ্ছে জিডিপিতে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির কন্ট্রিবিউশন শেয়ার ১.৫ শতাংশ এ নিয়ে যাওয়া আগামী দিনে। এই খাতে পাঁচ লাখ নতুন এমপ্লয়মেন্ট জেনারেট করা। তিনি বলেন, এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম এসএমই ক্লাস্টার ম্যাপিং হালনাগাদ করা। ইয়ুথ অন্ট্রাপেনরশিপ ফর স্টুডেন্টস অ্যান্ড স্টার্টাপ কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি মেন্টরশিপ দক্ষতা উন্নয়ন, কেন্দ্রীয় উদ্যোক্তা ডাটাবেজ প্রতিষ্ঠান এবং দেশী বিদেশী বাজারে প্রবেশের সহায়তাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এসব পদক্ষেপ আগামী দিনে এই খাতকে আরো প্রতিযোগিতামূলক করবে, উদ্ভাবননির্ভর করবে এবং টেকশই ভিত্তির ওপরে দাঁড় করাবে।

শিল্পপার্ক স্থাপনের কথা উল্লেখ করে আবদুল মুক্তাদির বলেন, আমাদের বিসিকের আন্ডারে যতগুলো শিল্পপার্ক আছে এইগুলোর বার্ষিক এক্সপোর্ট হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। জিডিপিতে ৬৫ হাজার কোটি টাকার জোগান দেয় এই বেসিক শিল্প। অনেকেই এটার খোঁজখবর রাখেন না। আগামী দিনে এই খাতটার মধ্যে আরো জীবন আনার জন্য আমরা যেসব জায়গায় ইতোমধ্যে শিল্পপার্ক স্থাপিত হয়েছে এবং সেখানে আর বরাদ্দযোগ্য কোনো প্লট নেই। তার মানে আমরা ধরে নিচ্ছি যে এখানে আরো এপিটাইট আছে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, ফিজিবিলিটি স্টাডির সাপেক্ষে তার প্রত্যেকটা জায়গায় আমরা বিসিক শিল্প পার্ক নতুনভাবে করব।

মন্ত্রী বলেন, ইকোনমির মধ্যে যদি একটা জীবনপ্রবাহ আনতে চান তাহলে ইনভেরিয়েবলি এই এমএসই খাতকে চাঙ্গা করতে হবে। আগামী দিনে শুধু ঋণপ্রবাহ না ঋণের এক্সেস তৈরি করা না। আমাদের আগামী দিনের লক্ষ্য যাতে এই খাতে বেশি বেশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়।