হঠাৎ করেই শম্বুক থেকে রকেট গতি

শেষ সময়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

শিক্ষা আইন নিয়ে তড়িঘড়ি, নিয়োগ বদলি নিয়েও সমালোচনা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি, ১৭শ’র বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও কর্মকর্তাদের বদলি নিয়েও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন যেখানে সম্ভুক গতি নিয়ে সবার আলোচনা সমালোচনা ছিল সেখানে ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রকেট গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

দীর্ঘ দেড় বছরেও শিক্ষা আইন নিয়ে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ সময় দিয়ে হঠাৎ করেই শিক্ষা আইন চূড়ান্ত করতে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। একই সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি, ১৭শ’র বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি ও কর্মকর্তাদের বদলি নিয়েও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন যেখানে সম্ভুক গতি নিয়ে সবার আলোচনা সমালোচনা ছিল সেখানে ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রকেট গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে তড়িগড়ি করে শিক্ষা আইন চূড়ান্ত করা নিয়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে মন্ত্রণালয়। বিশেষ করে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন, ২০২৬ দ্রুত অনুমোদনের উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শিক্ষা অধিকার সংসদ। সংগঠনটির মতে, নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় বেলায় কোনো ধরনের জনসম্পৃক্ততা, অংশীজন পরামর্শ ও জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন সমীচীন নয়। সংগঠনটির আহ্বায়ক অধ্যাপক নিয়াজ আসাদুল্লাহ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে শিক্ষা অধিকার সংসদ জানায়, শিক্ষা আইন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক প্রভাবসম্পন্ন আইন। এ ধরনের আইন প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণ, প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং বিস্তৃত নাগরিক আলোচনার সুযোগ থাকা আবশ্যক। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত খসড়া আইনটি অনুমোদন পেলে গণতান্ত্রিক আলোচনা ও অংশগ্রহণের সেই সুযোগ নিশ্চিত হবে না বলে সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

অপর দিকে শিক্ষা আইন বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গত শনিবার ৯৯৯ জন শিক্ষক বিবৃতি দিয়েছেন। মূল্যবোধ আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাত স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, দেশের জনগণ যখন নির্বাচনমুখী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মূল দায়িত্ব একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তুতি নেয়া, ঠিক সেই সময়ে তড়িঘড়ি করে শিক্ষা আইন ২০২৬-এর খসড়া প্রকাশ ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগে আমরা দেশের সচেতন শিক্ষকসমাজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

সূত্র আরো জানায়, সরকারের শেষ সময়ে এসে একসাথে এক হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির উদ্যোগ এবং কর্মকর্তাদের বদলি-পদোন্নতির কার্যক্রমে তৎপরতা বাড়িয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সরকারের শেষ সময়ে দ্রুতগতিতে এসব কাজ শেষ করতে মরিয়া মন্ত্রণালয়ের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা। জাতীয় নির্বাচনের আগে শিক্ষা খাতে একের পর এক ‘তড়িঘড়ি’ সিদ্ধান্তে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও সমালোচনা, যা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনে চলছে তোলপাড়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের কারসাজি।

শিক্ষা অধিকার সংসদ তাদের বিবৃতিতে জানায়, খসড়া শিক্ষা আইনে মূলত বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়গুলোই প্রাধান্য পেয়েছে। ভবিষ্যৎমুখী সংস্কার, কাঠামোগত পরিবর্তন ও গুণগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দিকনির্দেশনার সুস্পষ্ট প্রতিফলন এতে অনুপস্থিত। পাশাপাশি, যেসব জরুরি ও নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আইন দ্বারা নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন, সেগুলোর অনেকটাই বিধিমালার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে, যা আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শিক্ষা অধিকার সংসদ খসড়া আইনে কিছু সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা, শাসন কাঠামোর অনির্দিষ্টতা এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত দিকনির্দেশনার ঘাটতির কথাও উল্লেখ করেছে। এসব দুর্বলতা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা ও নীতিগত সঙ্কট তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করে।

সংগঠনটির মতে, শিক্ষা আইন প্রণয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত বিদ্যমান ও প্রচলিত নীতিমালা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধানের জন্য বাধ্যতামূলক আইনি ধারা সংযোজন করা। একই সাথে, দীর্ঘমেয়াদে গুণগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিস্তারে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেগুলো আইন দ্বারা সুরক্ষিত করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়নে বাধ্য থাকে। শিক্ষা অধিকার সংসদের আহ্বায়ক অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘গত দেড় বছর ধরে রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনায় শিক্ষা খাত সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত। তড়িঘড়ি করে শিক্ষা আইন প্রণয়ন সামগ্রিকভাবে দুর্বল ও সীমাবদ্ধ হবে। শিক্ষা সংস্কার সময়, সংলাপ ও ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে হওয়াই রাষ্ট্র ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সর্বোত্তম পথ।’

সূত্র আরো জানায়, ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে নিম্নমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত ৭টি স্তরে এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানের জন্য অর্থ বিভাগের কাছে ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্য প্রয়োজন হবে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা। ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী, ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেয়া হয়। এতে তিন হাজার ৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে এক হাজার ৭৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে নিম্নমাধ্যমিক স্তরে ৪৭১টি, মাধ্যমিকে ৬২৩টি, উচ্চমাধ্যমিক (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ১৩৫টি, উচ্চমাধ্যমিক (কলেজ) ১৪৫টি, ডিগ্রি স্তরে ৭৮টি এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে ২৭৭টি প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির জন্য বাছাই করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ২৭৭টি প্রতিষ্ঠানের জন্য ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়। আর এভাবে তড়িঘড়ি এমপিওভুুক্তি ঘিরেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শেষ সময়ে এমপিওভুক্তির পথ সহজ করতে ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’ সংশোধন করা হয়েছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা, ফলাফল ও একাডেমিক স্বীকৃতির মানদণ্ড শিথিল করে অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে দ্রুত এ ধরনের উদ্যোগ নেয়ার কথা বলছেন অনেকে। এমপিওভুক্তি করা নিয়ে কেন এত তাড়াহুড়া- এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার বিষয়টি স্বাভাবিক কার্যক্রম। এতে কোনো তাড়াহুড়া করা হয়নি। আমরা অনলাইন ও অফলাইনে সব কার্যক্রম সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেছি। এতে আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি সঠিক নয়।