তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশায় বোরো বীজতলা হুমকিতে

সরিষা, আলু, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ব্যাহতের শঙ্কা

শৈত্যপ্রবাহ, তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো ধানের বীজতলা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। সেই সাথে মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ ফসল সরিষা, আলু, শাকসবজি ও ডালজাতীয় ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলছে, তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে এবং সূর্যালোক কমে গেলে বোরো ধানের চারায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দেয়, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

কাওসার আজম
Printed Edition

চলমান শৈত্যপ্রবাহ, তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বোরো ধানের বীজতলা চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। সেই সাথে মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ ফসল সরিষা, আলু, শাকসবজি ও ডালজাতীয় ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলছে, তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে এবং সূর্যালোক কমে গেলে বোরো ধানের চারায় ‘কোল্ড ইনজুরি’ দেখা দেয়, যা ফলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

যশোর জেলায় গত কয়েকদিন ধরে তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। এখানকার কৃষকরা জানিয়েছেন, ঘন কুয়াশার কারণে বোরো ধানের বীজতলার চারা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই চারা হলুদ বা লালচে রঙ ধারণ করছে এবং অঙ্কুরোদগম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বীজতলা রক্ষায় তারা পলিথিন ঢেকে রাখার মতো ব্যবস্থা নিলেও ফলাফল পর্যাপ্ত হচ্ছে না, ফলে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দেশের উত্তরাঞ্চল গাইবান্ধা জেলায় চলমান শীত ও কুয়াশা পরিস্থিতি শাকসবজির জন্যও প্রভাব ফেলছে। এখানকার কৃষকরা জানিয়েছেন, দিনের বেলায়ও সূর্যের আলো না পাওয়া ও তীব্র শীতে ক্ষেতের শাকসবজি বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং নতুন চারা লাগানো কষ্টকর হচ্ছে। কৃষি অফিসের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঘন কুয়াশার কারণে শাকসবজির বীজতলা ও ছোট উদ্ভিদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না, যা উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলায় চলতি সপ্তাহে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতির শঙ্কা আরো প্রকট হয়েছে। শীতের তীব্রতায় তৈরি বীজতলার চারা ঠিকমতো গজিয়ে উঠছে না এবং যেসব চারা উঠছে সেগুলোর বৃদ্ধি দুর্বল, যা কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। কৃষকরা জানিয়েছেন, শীতের ঘন কুয়াশায় চারার উপরে ছত্রাকজনিত রোগের ঝুঁকিও বেড়ে গেছে।

নওগাঁর মান্দা উপজেলায় টানা কয়েকদিন সূর্যের আলো না ওঠা ও শীতের তীব্রতার কারণে শাকসবজির ক্ষেত ও বীজতলা পর্যায়ের শাকসবজির উৎপাদন কমে গেছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। দিনভর ঘন কুয়াশায় শাকসবজির চারা যথাযথভাবে বাড়ছে না এবং কুয়াশার ফাঙ্গাল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে, যার প্রভাবে শাকসবজি চাষিদের মধ্যে উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে পাওয়া তথ্যে আরো জানা গেছে, ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বড় একটি সময় সূর্যের আলো না থাকায় বীজতলার চারা হলুদাভ ও লালচে রঙ ধারণ করছে। অনেক জায়গায় বীজ অঙ্কুরোদগম ব্যাহত হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও সদ্য গজানো চারা পচে যাচ্ছে। কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে হবে, এতে খরচ বাড়বে এবং বোরো আবাদ সময়মতো শেষ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিফতরের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, যদি শীত ও কুয়াশা একইভাবে কিছুদিন স্থায়ী থাকে, তাহলে কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফত সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে দেশের বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ৫০ লাখ হেক্টরের বেশি। এর একটি বড় অংশের বীজতলা তৈরি হয় ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে। ঠিক এই সময়েই শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশা তীব্র আকার ধারণ করায় ঝুঁকি বেড়েছে। যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, গাইবান্ধা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে মাঠ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এগ্রোমেট ল্যাবের বিজ্ঞানীরা বলছেন, টানা কুয়াশা ও শীতের কারণে ফটোসিনথেসিস কমে যায়, ফলে চারার স্বাভাবিক বৃদ্ধি থেমে থাকে। তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে বোরো চারার শিকড় ও কাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে চারায় ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ বাড়ে এবং পরবর্তী সময়ে জমিতে রোপণের পর চারার টিকে থাকার হার কমে যেতে পারে।

শুধু বোরো নয়, চলমান রবি মৌসুমের অন্যান্য ফসলও ক্ষতির মুখে পড়ছে। সরিষার ক্ষেত্রে ঘন কুয়াশা ফুল ও ফল ধরার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। অনেক এলাকায় সরিষার ফুল ঝরে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আলুর ক্ষেতে দেরিতে রোগ দেখা দেয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, বিশেষ করে লেট ব্লাইটের আশঙ্কা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। শাকসবজি ও ডালজাতীয় ফসলে পাতায় দাগ, পচন ও বৃদ্ধির স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে বলে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিএইর কর্মকর্তারা বলছেন, বীজতলা রায় তাৎক্ষণিক কিছু ব্যবস্থাপনা জরুরি। শীতের সময় বীজতলায় ৩ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পানি ধরে রাখতে বলা হচ্ছে, যাতে মাটির তাপমাত্রা কিছুটা উষ্ণ থাকে। রাতে পলিথিন বা ছাউনি দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে, তবে দিনে সূর্যের আলো পাওয়ার জন্য তা খুলে রাখতে বলা হচ্ছে। সেই সাথে ছত্রাকজনিত রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন অনুযায়ী বালাইনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শীতের ধরন বদলে যাচ্ছে। কখনো হঠাৎ তীব্র শীত, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী কুয়াশা কৃষির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে শীতসহিষ্ণু জাত উদ্ভাবন, বীজতলা ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কৃষকদের আগাম সতর্কতা পৌঁছে দেয়াই ক্ষতি কমানোর প্রধান উপায়।

ব্রি’র এগ্রোমেট ল্যাবের প্রধান নিয়াজ মো: ফারহাত রহমান বলেন, তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে বীজতলার চারার বৃদ্ধি ধীর হয়ে যাচ্ছে এবং শীতজনিত রোগ- বিশেষত সিডলিং ব্লাইটের ঝুঁকি বাড়ছে। শীতের মধ্যে চারায় বৃদ্ধির গতি কমে যায়, ফলে চারার শিকড় দুর্বল হয়ে যায় এবং পাতা হলুদ বা লালচে রঙ ধারণ করতে পারে, যা বিকাশ ব্যাহত করে।

ব্রি’র এগ্রোমেট ল্যাবের প্রধান আরো বলেন, বীজতলায় ৩-৫ সেমি পানি ধরে রাখা মাটির তাপমাত্রা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং সঠিকমানের জৈব সার ও ইউরিয়া প্রয়োগে হেলদি সিডলিংস তৈরি করতে পারে।