এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধার প্রতীক হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে বিবেচনা করা হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল সেই ধারণাকে আবারো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জিপিএ ৫ পাওয়া পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৭২ শতাংশই ন্যূনতম নম্বর অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। এই ফলাফল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ভর্তি দফতরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা এবং কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান- এই তিন ইউনিটে মোট ৪৬ হাজার ৮৬১ জন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার ৯১৩ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন, যা শতকরা হিসাবে ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ফলধারী প্রায় ৭২ দশমিক ৪৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য নির্ধারিত ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কাঠামো শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও ভাষাগত দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা। সেখানে ১০০ নম্বরের এই পরীক্ষায় ৬০ নম্বর এমসিকিউ এবং ৪০ নম্বর লিখিত অংশের জন্য নির্ধারিত থাকে। নিয়ম অনুযায়ী, এমসিকিউ অংশে ন্যূনতম ২৪ নম্বর না পেলে পরীক্ষার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় এবং তার লিখিত খাতা মূল্যায়ন করা হয় না। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যর্থ হওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশই এমসিকিউ অংশে প্রয়োজনীয় নম্বর তুলতে পারেননি।
ইউনিটভিত্তিক ফলাফলেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিজ্ঞান ইউনিটে ২৫ হাজার ৩৪৫ জন জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ছয় হাজার ৯১৬ জন, পাসের হার ২৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটে চার হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে পাস করেছেন এক হাজার ৬২১ জন, যা ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্য দিকে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে ১৬ হাজার ৯৭৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন চার হাজার ৩৭৬ জন, পাসের হার ২৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এ ধরনের ফল নতুন নয়; বরং গত কয়েক বছর ধরে এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে জিপিএ ৫ পাওয়া ৯৮ হাজার ১৫৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১৬ হাজার ৫৩৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সে সময় পাসের হার ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। এর আগের বছর ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এই হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলছে, জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বাড়লেও তাদের গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।
শিক্ষাবিদ ও ভর্তি প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা বলছেন, বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতি ও মূল্যায়নের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার মৌলিক পার্থক্যই এই বৈষম্যের প্রধান কারণ। তাদের মতে, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে এখনো মুখস্থনির্ভর শিক্ষার প্রাধান্য রয়েছে। গাইড বই ও ‘সাজেশন’নির্ভর প্রস্তুতির মাধ্যমে বোর্ড পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করা সম্ভব হলেও তা শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান বা বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে। অন্য দিকে ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন করা হয় ধারণাভিত্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী, যা মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়াও কোভিড-১৯ মহামারীর পর সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পাঠদান এবং মূল্যায়নের প্রভাবও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে শিক্ষার্থীদের মৌলিক ধারণাগত ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সময় স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একই সাথে বোর্ড পরীক্ষায় নম্বর প্রদানে অতিরিক্ত উদারতার অভিযোগও দীর্ঘ দিন ধরে রয়েছে, যা জিপিএ ৫-এর সংখ্যা বাড়ালেও শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত করতে পারছে না।
শিক্ষাবিশ্লেষকদের মতে, জিপিএ ৫ এখন অনেকাংশে একটি ‘সংখ্যাগত সাফল্যে’ পরিণত হয়েছে, যার সাথে প্রকৃত মেধা বা দক্ষতার সামঞ্জস্য সবসময় থাকে না। ভর্তি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, বর্তমান মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে অযথা প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে, যা পরে হতাশায় রূপ নিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিউটিটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, জিপিএ ৫ এখন একধরনের মোহে পরিণত হয়েছে; এর প্রকৃত মূল্য কমে গেছে। ভর্তি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম নম্বর অর্জনে ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, এসএসসি ও এইচএসসির মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ত্রুটি রয়েছে। একই সাথে শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরো বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি সঙ্কটময় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি কার্যকর শিক্ষা কমিশন গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বের করা জরুরি।
যুগোপযোগী, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং দক্ষতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এই সনদনির্ভর শিক্ষার বোঝা দেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।



