নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্নীতিবাজদের সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হবে এবং দুর্নীতি বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল মঙ্গলবার শিল্পকলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশন আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের সভাপতিত্বের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আগে দুর্নীতিগ্রস্ত লোককে সামাজিকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হতো; মানুষ ঘৃণা করা। তারা ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে পারত না। আর এখন লাফ দিয়ে আমরা যাই বিয়ে দিতে, সম্মান জানাতে। সমাজে দুর্নীতিকে ঘৃণা করতে হবে। বর্তমানে দুর্নীতিবাজ পুরস্কৃত হচ্ছে। তিনি বলেন, সিস্টেমকে উন্নত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে। কারণ রাজনীতিবিদরা ঠিক থাকলে সমাজে পচন ধরবে না; বরং দুর্নীতি কমবে।
অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আর্থিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বড় বিষয়। হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে, শাস্তি কি দেবেন? সারা জীবন কারাগারে থাকলেও সাজা দেয়া হয় না। কারণ দেশের অনেক ক্ষতি তারা করে ফেলেছেন। সমাজের সব ব্যক্তির পক্ষ থেকে দুর্নীতির তথ্য আসতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, শুধু শাস্তি দিয়ে পৃথিবীর কোথাও দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব হয়নি। সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে ১৪-১৫ ধরনের দুর্নীতি রয়েছে; কিন্তু আমরা শুধু ঘুষ নিয়ে কাজ করছি। দুর্নীতি এখন বিজ্ঞান হয়ে গেছে। নিত্য নতুন কৌশল দেখা যাচ্ছে।
সভাপতির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন বলেন, আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে দুর্নীতি ঢুকে গেছে, সেটাকে ধীরে ধীরে নির্মূল করা সম্ভব। এখনকার বাস্তবতা হলো গত ১৫ বছরে যেসব দেশে আমাদের বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে গেছে, সেখানে আজ আমাদের কার্যকর যোগাযোগ নেই - এমনকি যোগাযোগের পথও খুঁজে পাচ্ছি না। বিদেশে আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ‘ডার্টি মানি’ হিসেবে পড়ে আছে, আর সেসব দেশে এ অর্থ উদ্ধার বা ব্যবস্থাপনার মতো লোকবলও আমাদের নেই।
তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে যারা অপরাধ করেছেন তাদেরকে আমাদের দেশের রাজনৈতিক এলিটরা কোটি টাকার বিনিময়ে সীমান্ত পার করে দিয়েছেন। এ সব লোককে আপনারা নির্বাচিত করবেন কি না তা চিন্তা করতে হবে। এখন সময় এসেছে এমন লোকদের আমরা নির্বাচিত করব কি না, এটা ভাবার।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আগে মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে টাকা আসতো। এখন বাস্তবতা উল্টো। বাংলাদেশ থেকে অর্থ আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে যায় এবং পরে কোনো না কোনোভাবে আবার দেশে ফিরে আসে। এ সব লেনদেনে বিভিন্ন ধরনের ‘ইনসেন্টিভও’ থাকে। এত বড় কাঠামো একদিনে, এক মাসে বা এক বছরে বদলানো সম্ভব নয়।
আবদুল মোমেন বলেন, ভোট হলে শতভাগ লোক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেবে, তারপরও দুর্নীতি দূর করা কঠিন। আগামী নির্বাচন পরবর্তী শাসনব্যবস্থায় স্বৈরশাসক, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী রাখলে উন্নত দেশ পাওয়া কঠিন। ক্ষমতাচ্যুতরা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদেরকে যারা সহযোগিতা করেছে, টাকার বিনিময়ে তাদের ভোট না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
চেয়ারম্যান বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে বায়তুল মোকাররমের খতিব। এটিই দেখায় দুর্নীতি কত গভীরে পৌঁছেছে। যদি শুরুতেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া যেত, তাহলে আমাদের ১৫-১৬ বছরের ভোগান্তি হতো না।
তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পদবিবরণী জমা দিয়েছিলেন। সেখানে কৃষিজমির পরিমাণ দেখানো হয়েছিল ৫ দশমিক ২১ একর। ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন যাচাই করেও তাতে সমস্যা পাওয়া যায়নি; কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, জমি রয়েছে ২৯ একর। গাড়ির বিবরণীতেও অসঙ্গতি পাওয়া যায়- অতিরিক্ত দু’টি গাড়ি যুক্ত ছিল, যার একটি তৎকালীন এক এমপি এবং অন্যটি সাবেক যুব প্রতিমন্ত্রীর নামে - এগুলো ‘পাঁচ নম্বর সুধা সদন’-এর নামে কেনা হয়েছিল এবং সরকারের ভর্তুকিও দেয়া হয়নি।
তিনি বলেন, যদি তখনই এসব অসঙ্গতি ধরা হতো, সে ক্ষেত্রে তার নমিনেশন বাতিল হতো। নমিনেশন বাতিল হলে তিনি এমপি বা প্রধানমন্ত্রী কিছুই হতে পারতেন না। এমনকি তার দল ক্ষমতায় আসত কি না সেটাও প্রশ্ন ছিল।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, দুদকের কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী, দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম, দুদক মহাপরিচালক মীর মো: জয়নুল আবেদীন শিবলী, আব্দুল্লাহ আল জাহিদ, আক্তার হোসেন, আবু হেনা মুস্তফা জামান, মোকাম্মেল হক, দুদকের পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, উপসহকারী পরিচালকসহ পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এর আগে সকালে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে দুদক কার্যালয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন দুদক চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মোমেন। পতাকা উত্তোলন ও বেলুন উড়িয়ে দিনব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। পরে দুদকসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতামূলক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার মিঞা মুহাম্মাদ আলী আকবর আজিজী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাফিজ আহসান ফরিদ এবং দুদকের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী।



