যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অব্যাহত ইসরাইলি হামলা

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ফেরা ঠেকাতে হুমকি ও অর্থের প্রলোভন ইসরাইলের

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দীর্ঘ দুই বছরের ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর গাজায় ফেরার অপেক্ষায় থাকা ফিলিস্তিনিরা রাফাহ সীমান্তে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে চরম লাঞ্ছনা, আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের শিকার হচ্ছেন। এক দিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে জোরপূর্বক স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে, অন্য দিকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির তোয়াক্কা না করেই গাজা ও পশ্চিম তীরে নির্বিচারে গুলি ও হামলা চালাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের বরাতে মিডলইস্ট মনিটর জানিয়েছে, রাফাহ সীমান্ত দিয়ে গাজায় প্রবেশ করতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর পদ্ধতিগত নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। অনেককে অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মিসরে ফিরে যেতে চাপ দেয়া হচ্ছে, আবার কাউকে কাউকে ইসরাইলি বাহিনীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে।

গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, সীমান্ত আংশিক খোলার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২৭ শতাংশ যাত্রী যাতায়াত করতে পেরেছেন। নিবন্ধিত এক হাজার ৮০০ জনের মধ্যে মাত্র ৪৮৮ জনকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছে, বাকিদের ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর জানিয়েছে, প্রত্যাবর্তনকারীদের চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে এবং তাদের ব্যক্তিগত মালামাল বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। এমনকি দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হলেও তাদের টয়লেট বা চিকিৎসার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না।

ইসরাইলি গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ‘আবু শাবাব’ নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে হামাসবিরোধী কাজে ব্যবহার করছে ইসরাইলি সেনারা। এই গোষ্ঠীটিই এখন সীমান্তে ফিরে আসা ফিলিস্তিনিদের তল্লাশি ও আটক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন এবং ‘জোরপূর্বক স্থানান্তর’ হিসেবে অভিহিত করে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়েছে।

ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি: অব্যাহত প্রাণহানি

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় শান্তির দেখা মেলেনি। গতকাল শনিবারও ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে আনাদোলু এজেন্সির এক খবরে বলা হয়েছে। চিকিৎসা সূত্র জানায়, খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে এক তরুণী ও এক বৃদ্ধ এবং নেটজারিম এলাকায় এক তরুণী মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া গাজা শহরের দক্ষিণে আল-মুঘরাকা এলাকায় ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ পায়ে গুলিবিদ্ধ হন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ইসরাইলি বাহিনী গাজা শহরের পূর্বাঞ্চল, বুরেইজ শরণার্থী শিবির ও জেইতুন এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে কয়েকটি আবাসিক ভবন ধ্বংস করেছে। রাফাহ ও গাজার আকাশে যুদ্ধবিমানের হামলাও অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৫৯১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৫৭৮ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের উদ্বেগ

এ দিকে আলআরাবিয়ার খবর অনুসারে, ইথিওপিয়ায় অনুষ্ঠিত আফ্রিকান ইউনিয়নের ৩৯তম সম্মেলনে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নে ইসরাইলি বাধা অপসারণের জোর দাবি জানিয়েছেন। তার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মুস্তাফা বক্তব্যটি পাঠ করেন। আব্বাস বলেন, ইসরাইল ক্রমাগত চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে। তিনি গাজা পরিচালনার জন্য গঠিত টেকনোক্র্যাট কমিটির কাজে সহযোগিতা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

এ দিকে আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলী ইউসুফ ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলমান ‘নিধনযজ্ঞ’ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ফিলিস্তিনের এই ভোগান্তি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই নৃশংসতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত।’

পশ্চিমতীরে তাণ্ডব ও হামলা

অন্য দিকে কেবল গাজায় নয়, পশ্চিমতীরেও ইসরাইলি সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, গত শুক্রবার নাবলুসের দক্ষিণে তালফিত গ্রামে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা ইসরাইলি সেনাদের সুরক্ষায় হামলা চালালে অন্তত ২৫ জন ফিলিস্তিনি আহত হন। হামলাকারীরা বাড়িঘর ও মসজিদের দিকে গুলি ছোড়ে এবং বাসিন্দাদের গাড়ি ভাঙচুর করে।

এই সংবাদ কাভার করতে গিয়ে আলজাজিরার সাংবাদিকরা ইসরাইলি বাহিনীর হামলার শিকার হন। সংবাদকর্মী থারওয়াত শাকরা জানান, তারা স্পষ্টভাবে প্রেস জ্যাকেট পরে থাকলেও সেনারা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ারগ্যাস ছোড়ে, যাতে তাদের ক্যামেরার সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। উল্লেখ্য, ইসরাইল ইতোমধ্যে সে দেশে আলজাজিরার কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসেই পশ্চিমতীরে ৪৬৮টি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত পশ্চিমতীরে এক হাজার ১১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও ভবিষ্যৎ সঙ্কট

জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনিদের নিরাপদে ও মর্যাদার সাথে নিজ ঘরে ফেরার সুযোগ দেয়া একটি ন্যূনতম শর্ত। কিন্তু রাফাহ সীমান্তে ইসরাইলের বর্তমান নীতি সেই অধিকারকে পদদলিত করছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজা পুনর্গঠনে যেখানে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, সেখানে অব্যাহত হামলা ও সীমান্ত অবরোধ এই সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করছে।