- এক নারীর কাছে মিলছে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য
- তদন্তে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে
- মোটরসাইকেলের মালিকসহ আটক ৩
- ‘গান পয়েন্টে’ থাকা জুলাইযোদ্ধাদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ
ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে ভারত থেকে। সেখানে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের পরিকল্পনায় ওসমান হাদিকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। কিলিং মিশনে থাকা প্রধান দুই সন্দেহভাজন যুবলীগ নেতা শেখ মো: আলমগীর হোসেন ও ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত হয়েছে। জাহাঙ্গীর কবির নানকের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মো: মাসুদুর রহমান বিপ্লবের তত্ত্বাবধানে এই হত্যাকারীরা ভারতে অবস্থান করছে বলে গোয়েন্দারা ধারণা করছেন। গতকাল একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে ওসমান হাদিকে বিদেশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আজ এভারকেয়ার থেকে তাকে থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে পাঠানো হতে পারে। তার অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে হাদিকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অপরদিকে গতকাল হাদিকে গুলি করতে যে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়েছে সেটি জব্দ এবং তার মালিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তার নাম আব্দুল হান্নান, তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো: নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, র্যাব সদস্যরা তাকে আটকের পর পল্টন থানায় হস্তান্তর করেছে। পুলিশ এ ঘটনায় আরো দুই সন্দেহভাজনকে আটক করেছে। তিনি আরো বলেন, মূল হত্যাকারী এখনো দেশে আছে। তারা দেশত্যাগ করতে পারেনি।
ডিএমপির গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, হাদিকে গুলির সময় বাইকে থাকা আলমগীরের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে আটক করেছে ডিবি। তারা হলেন- মো: মিলন ও হাবিবুর রহমান হাবিব। গতকাল রোববার ভোরে রাজধানীর অদূরে হেমায়েতপুরের জাদুর চর থেকে তাদের আটক করা হয়। আটককৃত দু’জন কিলিং মিশনে অংশ নেয়া যুবলীগ নেতা আলমগীরের খুবই ঘনিষ্ঠ। ঘটনার দিন আলমগীর ও আটক দু’জনের মধ্যে সব মিলিয়ে শতাধিকবার মুঠোফোনে কথা হয়েছে। একটি সূত্র বলছে, আলমগীরের মুঠোফোন থেকে মিলনের মুঠোফোনে ৭৪ বার যোগাযোগের তথ্য মিলেছে। অপরদিকে হাবিবের মুঠোফোনে আলমগীরের মুঠোফোনে যোগাযোগ হয়েছে ৫২ বার।
এ দিকে ওসমান হাদিকে ফিল্মি স্টাইলে গুলি করার বিষয়ে আরো চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মোটরসাইকেলের চালক ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওসমান হাদিকে গুলি করার আগে এক নারীর সাথে থাকতেন। ওই নারীকে হেফাজতে নেয়ার পর গোয়েন্দাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। জানা গেছে ওই নারীর নাম মারিয়া ওরফে হ্যাপী। আগারগাঁওয়ে একটি বাসায় তারা বসবাস করতেন। হাদিকে গুলি করার আগেই তারা ওই বাসা থেকে সটকে পড়েন। এরপর আলমগীর ও ফয়সাল একটি রিসোর্টে ওঠেন।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ওই নারীকে রক্ষিতা হিসেবে ব্যবহার করতেন ফয়সাল। ঘরে বসেই বিভিন্ন লোকদের সাথে কথা বলতেন। ওই কথা আড়ি পেতে শুনতেন ওই নারী। বৃহস্পতিবার যখন কথা বলছিলেন তখন সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয় শুক্রবার হাদিকে হত্যা করার। রাতে ওই নারীকে ফয়সাল বলেন, আগামীকাল (শুক্রবার) এমন এক ঘটনা ঘটবে যা পুরো দেশ কেঁপে উঠবে। ফয়সাল ওই নারীকে বলেন, আজ আমার সেবাযতœ করো। কাল আমাকে ভারতে চলে যেতে হবে। তোমাকে অনেক টাকা দিবো। গোয়েন্দাদের দেয়া তথ্যে আরো জানা যায়, ওই নারীকে কলগার্ল হিসেবে সম্প্রতি ব্যবহার করে আসছিলেন ফয়সাল। ওসমান হাদিকে যখন হত্যার পরিকল্পনা আসে ভারত থেকে তখন থেকেই আড়ি পাতেন ওই নারী। সেখান থেকেই বিভিন্ন নির্দেশনা আসতো ফয়সালের কাছে। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আরো অনেকের নাম পেয়েছে গোয়েন্দারা। কয়েকজন গোয়েন্দাদের হেফাজতে আছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
এদিকে হাদিকে গুলি করার সময় তার সাথে থাকা আরো অনেকে জড়িত রয়েছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দারা। তাদের ভাষ্য এ ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে। কারণ হাদির ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছে গোয়েন্দারা। তাদেরও আটকের পর জিজ্ঞাসাদের জন্য হেফাজতে নিয়ে আসা হবে। তাদের মধ্যে কয়েকজন হাসপাতালের সামনে হাদির খোঁজখবর নিচ্ছেন। যেদিন ওসমান হাদিকে গুলি করা হয় সেদিন তারা মতিঝিল মসজিদের সামনেই দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। তবে রহস্যজনক কারণে ওই এলাকার একটি সিসিক্যামেরা অকার্যকর দেখা যায়। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, সেটি পরিকল্পিতভাবেই অকার্যকর করা হয়েছে।
জুলাইযোদ্ধাদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ : গতকাল ওসমান হাদির ওপর হামলার তদন্ত সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি জানাতে বিকেল সোয়া ৪টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এন মো: নজরুল ইসলাম বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শীর্ষ জুলাইযোদ্ধাদের অনেকের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এজন্য তাদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
তিনি বলেন, হাজার হাজার জুলাই যোদ্ধার নিরাপত্তা ব্যক্তি পর্যায়ে বা আলাদা করে নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তবে হাদির মতো যারা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন, অথবা ‘গান পয়েন্টে’ আছেন, তাদের নিরাপত্তা জোরদারের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ।
ঘটনার তদন্তে জানা যায়, সন্দেহভাজন ব্যক্তি হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ভুক্তভোগী ওসমান হাদিকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও শনাক্তকৃত সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং অভিযান চলমান রয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা যেন সীমান্ত পার না হতে পারে, সেজন্য তাদের পাসপোর্ট সংগ্রহ করে ব্লক করে দেয়া হয়েছে। সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেফতারের সহযোগিতার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
অস্ত্রের ধরন জানতে চাওয়া হলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, ফয়সালকে নভেম্বর মাসে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন ও চাঁদাবাজির মামলা আছে। দু’টি মামলায় জামিনে বের হয়ে সে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম বলেন, গতকাল ভিপি নূর একটা বক্তব্য দিয়েছেন। জুলাইযোদ্ধা এক হাদি না, হাজারো, লাখো জুলাইযোদ্ধা আছে। এই লাখো জুলাইযোদ্ধার ইন্ডিভিজুয়াল সিকিউরিটি নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তবে সার্বিক সিচুয়েশনটা আমাদের সিকিউর করতে হবে। রাষ্ট্রকে সিকিউর করতে হবে। রাজধানীকে সিকিউর করতে হবে। আমরা এই কাজটাই করছি।
এদিকে ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টার ঘটনার মূল অভিযুক্ত ফয়সালের স্বাক্ষরিত বিপুল পরিমাণ চেকবই ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ সন্দেহভাজন তিনজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে র্যাব।



