আজ ৭ জানুয়ারি। ফেলানী হত্যা দিবস। ২০১১ সালের এই দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয় ফেলানী নামের ১৫ বছরের এক কিশোরী। ভারতীয় আধিপত্যবাদ এবং সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে এই দিবসটি ফেলানী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। দিনটি ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধীদের জন্য এক দিকে যেমন শোকের, অপর দিকে আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক দৃঢ়প্রত্যয়ের দিন।
ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক এলাকায় একটি সড়কের নাম যখন রাখা হয় ‘ফেলানী এভিনিউ’, তখন সেটি নিছক একটি নামফলক বসানোর ঘটনা ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের এক ধরনের নীরব স্বীকারোক্তি। রাষ্ট্র যেন বলেছে, হ্যাঁ, এই জাতির বুকে এমন এক যন্ত্রণা আছে, যা ভোলা যায় না, ভোলা উচিতও নয়। এই নামের ভেতর লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সত্য আর এক অসমাপ্ত লড়াইয়ের ইতিহাস। সেই লড়াই ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জনলড়াই।
এই করুণ গল্পের শুরু আজ থেকে ১৫ বছর আগের এক কনকনে শীতের সকালে। ২০১১ সালের জানুয়ারির সেই ভোর। বয়স মাত্র পনেরো। ভারতের কোচবিহারে বাবার সাথে থাকত ফেলানী খাতুন। বাংলাদেশে তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। সেই বিয়ের স্বপ্ন, নতুন জীবনের আশায় বাবার হাত ধরে সে ফিরছিল নিজের বাড়ির পথে ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া। একটি মই। সেই মই বেয়ে পার হওয়ার চেষ্টা। ঠিক তখনই ফেলানীর জামা আটকে যায় কাঁটাতারে। ভয়ে, আতঙ্কে সে চিৎকার করে ওঠে। আর সেই চিৎকারের জবাব আসে একটি গুলিতে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য অমিয় ঘোষের ছোড়া একটিমাত্র গুলি মুহূর্তে সব শেষ করে দেয়। কিন্তু ভয়াবহতা সেখানেই থামেনি। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে ফেলানীর নিথর দেহ ঝুলেছিল কাঁটাতারের ওপর। সেই ছবি কেবল একটি আলোকচিত্র নয়, তা সীমান্ত হত্যার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে আছে আজও। ছবিটি ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও দাদাগিরির জ্যান্ত প্রতীক।
হত্যার পর শুরু হয় আরেক যুদ্ধ। ন্যায়ের জন্য, বিচারের জন্য এক দীর্ঘ, যন্ত্রণাময়, অন্তহীন অপেক্ষা। ফেলানীর বাবা নুরুল ইসলাম নূরু কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশে এলেও মেয়ের আর্তচিৎকারে সাড়া দিতে পারেননি। ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পর বিএসএফ ফেলানীর লাশ ফেরত দেয়। ফেলানীর বাড়ি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রামখানা ইউনিয়নের বানার ভিটা গ্রামে।
সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা ফেলানীর ঝুলন্ত লাশের ছবি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয়। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বর্বরতা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফেলানী হয়ে উঠে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতীক। বিশ্ব মিডিয়ায় ফেলানী খাতুনের লাশ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার ঝুলন্ত ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ায় ভারত হত্যাকারী বিএসএফ সদস্যদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রহসনের বিচার করা হয়।
ওই সময়ের আওয়ামী লীগ সরকার ফেলানী হত্যার কড়া প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে পারেনি। বরং তৎকালীন সরকার ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের নাকি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম করছে’ বলে প্রচার করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার প্রচার করে ‘ভারতের সব চাওয়া-পাওয়া পূরণ করা হয়েছে’।
ফেলানী হত্যার পর হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো মানবাধিকার সংগঠন বিএসএফকে একটি ‘খুনি বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করে। বিশ্বজুড়ে প্রচার হয় প্রতিষ্ঠিত বিএসএফ একটি বর্বর বাহিনী। এই বাহিনী এর আগেও বহু নারী ও শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ফেলানী হত্যার আগে ২০১০ সালের মে মাসে ঠাকুরগাঁওয়ের রতœাই সীমান্তের এক কিলোমিটার ভেতরে এসে পারুল নামে ১৪ বছরের এক কিশোরীকে হত্যা করা হয়।
এ দিকে, বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রতিবাদ ও বিশ্বের দেশে দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় ভারত ফেলানী হত্যার বিচারের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিএসএফের ডিজি বাংলাদেশে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে অঙ্গীকার করে ‘আর কোনো বাংলাদেশী নাগরিকের ওপর তারা কোনো মারণাস্ত্র ব্যবহার করবেন না’। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি তারা রাখতে পারেননি। এরপরও সীমান্তে অগণিত নিরপরাধ মানুষ বিএসএফ ও ভারতীয় সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন। আওয়ামী ফ্যাসিষ্ট শাসনামলে ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ এই পৈশাচিকতা ফ্রি-স্টাইল লাইসেন্সের রূপ নিয়েছে। আর নরঘাতক ভারতীয় বাহিনীর এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে একবারও প্রতিবাদ করতে পারেনি আওয়ামী সরকার।
হত্যার পর শুরু হয় আরেক দীর্ঘ লড়াই। ন্যায়বিচারের লড়াই। ২০১৩ সালে ভারতের অভ্যন্তরীণ আদালতে অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হয়। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ফের বিচার শুরু হলেও তা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ২০১৫ সাল থেকে মামলাটি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। ১৫ বছরেও একটি শিশুহত্যার বিচার শেষ হয়নি।
এই দীর্ঘ অন্ধকার সময়েও একটি মানবিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথম দিন থেকেই ফেলানীর পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। বিজিবি শুধু সহানুভূতির কথা বলেনি, বাস্তব সহায়তা করেছে। ফেলানীর বাবাকে দোকান করে দিয়ে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে, নিয়মিত খোঁজ নিয়েছে, পাশে থেকেছে ছায়ার মতো। সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক দায়বদ্ধতার এই ভূমিকা বিজিবিকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
এই সহানুভূতি ও সমর্থনের ভেতর থেকেই জন্ম নেয় এক প্রতিজ্ঞা। ফেলানীর ছোট ভাই আরফান হোসেন বোনের হত্যার পর দৃঢ়সংকল্প করে যে সে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে যোগ দেবে। উদ্দেশ্য একটাই, যেন আর কোনো বাংলাদেশীকে ফেলানীর মতো সীমান্তে প্রাণ দিতে না হয়। নিজের যোগ্যতায় সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজ সে বিজিবির একজন সদস্য। ব্যক্তিগত শোককে সে রূপ দিয়েছে রাষ্ট্রসেবার শক্তিতে।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ফেলানী এভিনিউ। এটি নিছক নামফলক নয়, বরং রাষ্ট্রের নীরব প্রতিবাদ ও স্মরণ। প্রতিদিন আন্তর্জাতিক মহলকে মনে করিয়ে দেয়া যে একটি পনেরো বছরের কিশোরীর হত্যার বিচার আজও বাকি।
আজ ফেলানী হত্যা দিবসে দাবিগুলো স্পষ্ট। ঝুলে থাকা বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করতে হবে। পরিবারকে ন্যায়বিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সর্বোপরি সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কারণ ফেলানী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বহু সীমান্ত হত্যার এক করুণ প্রতীক।
দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
অধিকারের বিবৃতি
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার জানায়, ফেলানী হত্যা ছিল বিগত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের ওপর ভারত সরকারের আগ্রাসী নীতির একটি চরম দৃষ্টান্ত। সীমান্তে বাংলাদেশী শিশু-কিশোরদের হত্যা-নির্যাতন বিএসএফের জন্য নতুন কিছু নয়। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ২৪ জন শিশু-কিশোরকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) হত্যা করে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় যে, ২০১০ সালে বিএসএফ সদস্যদের নির্যাতনে হাসনাত হালশাম (১৫) নামের এক স্কুল ছাত্র নিহত হন। ২০০৯ সালে মনজুয়ারা (১২) নামে একজন শিশু এবং ২০১৭ সালে সোহেল রানা ও হারুন অর রশীদ নামে আরো দু’জন স্কুলছাত্র, ২০১৯ সালে সোহেল রানা বাবু (১৪) ২০২২ সালে স্কুলছাত্র মিনারুল ইসলাম (১৬) ২০২৪ সালে স্বর্ণা দাস নামে ১৪ বছরের কিশোরী , ও জয়ন্ত কুমার সিংহ নামে এক ১৫ বছরের কিশোরসহ ২৫ জন শিশু-কিশোরকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করে।
অধিকার ফেলানীসহ বিএসএফ সদস্যদের দ্বারা বাংলাদেশী নাগরিকদের সমস্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচারের জন্য দাবি জানাচ্ছে। এ ছাড়া অধিকার বাংলাদেশের ওপর ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। অধিকার মনে করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কখনোই এই ধরনের আগ্রাসনকে মেনে নিতে পারে না। বাংলাদেশকে তিনদিক থেকে ঘিরে রাখা ভারতের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। তা না হলে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক অসন্তোষ দানা বেঁধেছে তা শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।



