দক্ষিণাঞ্চলে ৫টি নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির

যারা দল সামলাতে পারে না, তারা দেশ সামলাবে কিভাবে ?

Printed Edition
পটুয়াখালীর বাউফলে নির্বাচনী সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন ডা: শফিকুর রহমান। নিচে সমাবেশের একাংশ : নয়া দিগন্ত
পটুয়াখালীর বাউফলে নির্বাচনী সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন ডা: শফিকুর রহমান। নিচে সমাবেশের একাংশ : নয়া দিগন্ত

বরিশাল ব্যুরো ও পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি প্রতিনিধি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, বিগত ১৬ বছর জাতি একটি দলকে দেখেছে এবং ৫ আগস্টের পর আরেকটি দলকে দেখছে। যারা নিজেদের দলই সামলাতে পারে না, তারা দেশ সামলাবে কীভাবে? তিনি ঘোষণা দেন, আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি নতুন বাংলাদেশকে কাঁধে নিয়ে সূর্য উদিত হবে। আসন্ন নির্বাচনে কোনো দল বা পরিবারের নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরে ১১-দলীয় জোটের বিশাল ৫টি নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ দিন হেলিকপ্টারযোগে তিনি দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঝটিকা সফর করেন এবং নির্বাচনী জোয়ার তৈরি করেন।

ডা: শফিকুর রহমান তার প্রতিটি জনসভায় ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক বিচারব্যবস্থা চাই যেখানে সাধারণ মানুষ যে আইনে শাস্তি পায়, রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী অপরাধ করলেও তাকে একই আইনে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। ইনসাফের ভিত্তিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে এবং কোনো মামু-খালুর তদবিরে কেউ পার পাবে না।’ তিনি আরো যোগ করেন, অতীতের ৫৪ বছরে যাদের সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত করা হয়েছে, জামায়াতের উন্নয়ন সেখান থেকেই শুরু হবে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির ডালপালা ধরে টান দেবো না, বরং শিকড় ধরে টান দেবো। যারা এ দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে, আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের পেটের ভেতর থেকে সেই অর্থ বের করে আনব এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেবো।’ তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যারা নিজেরা লুটপাটের সাথে জড়িত নয়, কেবল তারাই এই পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

নারী নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এক আবেগঘন বক্তব্যে ডা: শফিক বলেন, ‘জীবন দিতে রাজি আছি, কিন্তু কোনো মায়ের ইজ্জত দিতে রাজি নই। আমরা দেশে মা ও বোনদের জন্য শতভাগ নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করব।’ তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দেশে কোনো চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা দখলবাজি চলতে দেয়া হবে না। যারা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ দখল করবে বা মামলা বাণিজ্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশে করে তিনি বলেন, ‘আমরা যুবকদের হাতে কোনো ‘কার্ড’ তুলে দিয়ে তাদের অসম্মান করতে চাই না। আমরা তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। যুবকদের যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তাদের আত্মমর্যাদাশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে।’ পিরোজপুরের জনসভায় তিনি আরো বলেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধ এবং হাদি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।

ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। জুমার নামাজের আজান হলে বক্তৃতার বিরতি দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান স্টেজেই সাধারণ মুসল্লিদের সাথে কাতারবদ্ধ হয়ে জুমার নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে তাকে স্থানীয় পাটিকর সম্প্রদায় একটি ঐতিহ্যবাহী ‘শীতল পাটি’ উপহার দেন। জামায়াত আমির সেই উপহার গ্রহণ করে মঞ্চেই পাটি বিছিয়ে কর্মীদের অভিবাদন জানান এবং কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নেন। তার এমন অমায়িক ও মানবিক আচরণে উপস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের পাটিকরসহ হাজার হাজার জনতা মুগ্ধ হন।

জনসভাগুলোতে ডা: শফিকুর রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘১২ তারিখের প্রথম ভোট হবে গণভোট- ‘হ্যাঁ’ ভোট। এর পরের ভোট হবে দাঁড়িপাল্লায়।’ তিনি বিএনপিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কিছু রাজনৈতিক শক্তি বাইরে ‘হ্যাঁ’ বললেও ভেতরে ‘না’ এর পক্ষে কাজ করছে, যা ভুল রাজনীতি।

প্রতিটি সমাবেশ শেষে তিনি ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে প্রতীক তুলে দেন। তারা হলেন: বরিশাল-৪ আসনের অধ্যাপক মাওলানা আব্দুল জব্বার, পটুয়াখালী-২ আসনের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, পিরোজপুর-১ ও ২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী, পিরোজপুর-৩ আসনে এনসিপি প্রার্থী (শাপলা কলি প্রতীক) এবং বরগুনা-২ আসনে অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসেন।

পটুয়াখালীর জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের নেতা নয়, প্রতিনিধি হতে চেয়েছি। আমরা দেখছি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য একটি বিশেষ দলের পক্ষে ষড়যন্ত্র করছে; তাদের উপযুক্ত শাস্তির আওতায় আনা হবে।’ এ ছাড়া এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন হেলালসহ জোটের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন।

দক্ষিণাঞ্চলের এই ৫টি জনসভায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। ডা: শফিকুর রহমান তার সফর শেষ করেন পিরোজপুরের বিশাল সমাবেশের মাধ্যমে। তিনি দেশবাসীকে ধৈর্য ধরে আগামী ১৩ তারিখের ‘নতুন বাংলাদেশের’ জন্য পাহারাদার হিসেবে কাজ করার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার আরসি কলেজ মাঠের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা জামায়াতের আমির শহিদুল ইসলাম। পটুয়াখালীর বাউফল পাবলিক মাঠের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন বাউফল উপজেলা আমির মাওলানা মো: ইসহাক মিয়া। ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান। পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় সভাপতিত্ব করেন পিরোজপুর জেলা আমির ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য তাফাজ্জাল হোসাইন ফরিদ। এ ছাড়াও ঝালকাঠির সমাবেশে মঞ্চ পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ ফরিদুল হকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।