নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হয়ে উঠেছিল এক মৃত্যু উপত্যকা। ক্যাম্পাসের হলগুলোকে পরিণত করা হয়েছিল এক দিকে অস্ত্রাগার অন্য দিকে মাদকসেবীদের মিনি বার। কথায় কথায় অস্ত্র উঁচিয়ে বীরত্ব জাহির করত ছাত্রলীগাররা। ক্যাম্পাসজুড়ে ছিল বহু টর্চার সেল। আর এসব টর্চার সেলে শিবির সন্দেহে কোনো ছাত্রকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সাধারণ ছাত্রদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকেও শিবির ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন চালানো হতো।
সে সময়কার অধ্যয়নরত চবি শিক্ষার্থীদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ২০০৮ সালের রহস্যঘেরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণ করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখলে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়। হলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রক্তপিপাসায় মেতে ওঠে তারা। ফ্যাসিবাদী ওই সময়ে চবি ক্যাম্পাসে পাঁচ শিবির নেতাকে নির্মমভাবে খুন করার পাশাপাশি দু’জনকে মৃত ভেবে ফেলে গেলেও ভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে যান। আহত এবং নির্যাতন করা হয় অনেককেই। অনেকে এখনো বেঁচে আছেন শারীরিক অঙ্গবৈকল্য নিয়ে।
চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তারের নেশায় রক্তপিপাসার প্রথম শিকার চবির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্র মহিউদ্দিন মাসুম। ২০১০ সালের ১১ মার্চ সন্ধ্যায় শিবির কর্মী মহিউদ্দিন মাসুম টিউশনি সেরে চট্টগ্রামের ষোলশহর রেলস্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষাই যেন শাটল ট্রেনের জন্য মাসুমের শেষ অপেক্ষা। ছাত্রলীগের রক্তপিপাসুরা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে নির্মমভাবে খুন করে মাসুমকে। তখনকার প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ছাত্রলীগের আক্রমণের বীভৎসতা এত ব্যাপক ছিল যে, স্ট্রেচারে কফিন রক্তে ভাসছিল। মহিউদ্দিন মাসুমের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজারের চকোরিয়ায়।
চবির রক্তপিপাসার্ত ছাত্রলীগারদের দ্বিতীয় শিকার মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র হারুনুর রশীদ কায়সার। ২০১০ সালের ২৮ মার্চ শিবির কর্মী শাহজালাল হলের আবাসিক ছাত্র কায়সার ক্যাম্পাস থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম শহরে যাচ্ছিলেন। পথে চৌধুরী হাট স্টেশনে তাকে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ট্রেন থেকে জোর করে নামিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। শিবিরের অভিযোগ, এ দু’টি হত্যায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী ব্ল্যাক জুয়েল, আকতার, মো: রাকিব হাসান, মো: সাকিব, মহসিন কবির রিয়েল, মিরাজুল ইসলাম ও মজিবুর রহমান জড়িত ছিল।
দুই শিবির কর্মীকে হত্যার পরও হলগুলোতে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পেরে ছাত্রলীগ আবারো রক্তের নেশায় মেতে ওঠে। ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের পীযূষ কান্তি বর্মণ, কাজী তানজিম হোসেন, আহসানুল করিম জনি, আশরাফুল ইসলাম আশা, আবুল মনসুর সিকদার, সুমন মামুনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো পয়েন্ট এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ও কুপিয়ে এবং গলা কেটে শিবির নেতা মাসুদ বিন হাবিব এবং মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদকে নির্মমভাবে খুন করা হয় বলে ছাত্রশিবিরের অভিযোগ।
এদের মধ্যে শিবিরের সদস্য মাসুদ বিন হাবিবকে গুলি ও কুপিয়ে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা নির্মমভাবে জখম করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাসুদ বিন হাবিবেব গ্রামের বাড়ি সিলেটের হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ। শিবিরের আরেক কর্মী মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদকেও জিরো পয়েন্ট এলাকায় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নির্মমভাবে খুন করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে তার বাড়ি। পিতা হুমায়ুন কবির একজন প্রবাসী।
২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি চবির শাহ আমানত হল দখলের নেশায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা পুলিশ ও প্রশাসনের উপস্থিতিতে শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলে পড়ে ছাত্রলীগাররা। সে দিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী ‘ধর ধর শিবির ধর, ধরে ধরে জবাই কর’ স্লোগান দিতে দিকে এগিয়ে যায় প্রকাশ্য অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। কিন্তু শিবির কর্মীদের নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার স্লোগানের শব্দে একপর্যায়ে পিছু হটে অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ। অবস্থান নেয় (হলের) মূল ফটকের সামনেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রক্টরিয়াল বডি এবং পুলিশ প্রশাসনের সামনেই চলে সশস্ত্র মহড়া আর অশালীন বাক্যালাপ। শিবিরের দায়িত্বশীলদের একাধিক অনুরোধে নিশ্চুপ সময়ক্ষেপণ ছাড়া কিছুই করেনি চবি প্রশাসন।
সে সময়কার শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় হল দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সে দিন হলের বাইরে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থানরত ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ধরার পরিবর্তে হল রেইডের নামে গ্রেফতার করা হয় হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ২১ শিবির নেতাকর্মীকে। এর বাইরে হলে অবস্থানরত অন্য শিবির নেতাকর্মীদেরকে ছত্রভঙ্গ করে রাখে পুলিশ। ইত্যবসরে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা হলে অবস্থানরত শিবির নেতাকর্মীদের ওপর মারণাস্ত্র নিয়ে গুলি চালানোর পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে থাকে। বেশ ক’জন শিবির কর্মী গুলিবিদ্ধ এবং চাপাতির আঘাতে রক্তাক্ত হয়। তাদের আক্রমণের মুখে দোতলার রেলিং থেকে পড়ে যাওয়া শাহ আমানত হলের শিবির নেতা রাহাতকে একা পেয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয় তার মাথাসহ পুরো শরীরজুড়ে। মৃত ভেবে তাকে ফেলে যায় তারা। পরে ওই শিবির নেতা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও মাথার খুলিবিহীন ছিলেন প্রায় দেড় মাস। হলে আটকা পড়া শিবির কর্মীদের রক্ষা করতে যাওয়া শাহ আমানত হল শিবিরের সেক্রেটারি মামুন হোসাইন এবং জীববিজ্ঞান অনুষদ সভাপতি সাইদুল ইসলাম রকিকে চাপাতি আর রামদা দিয়ে কোপানো হয় তাদের মাথাসহ সর্বাঙ্গে।
সে দিনের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া সাইদুল ইসলাম রকি এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, তাকে এবং মামুনকে মৃত ভেবে তারা (ছাত্রলীগার) রেখে গিয়েছিলেন; কিন্তু মামুন ভাই বেঁচে থাকার চেষ্টায় নড়াচড়া করছিলেন, চেষ্টা করছিলেন শ্বাস গ্রহণের। এতেই গলায় ছুরি বসিয়ে মামুন ভাইকে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা। নিজের ডান হাত এখনো কর্মক্ষম নয় বলে জানান রকি।
ফ্যাসিবাদী বিভীষিকাময় সময়ে দায়িত্বপালনকারী চবি শিবিরের সাবেক সভাপতি শরীফ উদ্দিন পাটোয়ারী নয়া দিগন্তকে সে সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, চবি ক্যাম্পাসে যারা শিবির করতেন কিছু নির্দিষ্ট এলাকা আমাদের জন্য প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। শাটল ট্রেন, শাহজালাল হল ও তার সামনের রাস্তা, ফ্যাকাল্টির ঝুপড়িগুলোসহ ক্যাম্পাসের আরো কিছু স্থান ছাত্রলীগের টর্চার সেলে পরিণত হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, শিবির সন্দেহে কোনো ছাত্রকে প্রকাশ্যে নির্যাতন করা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিগত স্বৈরাচারী আমলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীদের হাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের পাঁচজন ভাই শাহাদত বরণ করেন। ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি মামুন হোসেন ভাইয়ের শাহাদতের আমরা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। সে দিন আরো অনেক ভাই মারাত্মকভাবে আহত হন। ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্ট, শহীদ মিনারসহ অনেক স্থান আজও ছাত্রলীগের হাতে শিবির কর্মীদের ওপর চালানো নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করছে।
সে সময়ে ক্লাস থেকে ধরে নিয়ে নির্যাতন, পরীক্ষা বা ভাইভার পর তুলে নিয়ে গিয়ে মারধর করা ছিল সাধারণ বিষয়। এমনকি অনেককে নিরাপদে পরীক্ষা দিতে হলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হতো।
২০১৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে একে একে চবি ক্যাম্পাসের সব হল প্রশাসনের সহায়তায় ছাত্রলীগ অস্ত্রের জোরে দখল করে নেয়। সে সময়ে হলগুলোতে মদের আড্ডা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের অন্তঃকোন্দল ছিল চলমান, আর হলগুলো পরিণত হয়েছিল তাদের অস্ত্রাগারে।


