কুষ্টিয়ার ৪টি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াতের

আ ফ ম নুরুল কাদের, কুষ্টিয়া
Printed Edition
কুষ্টিয়ার ৪টি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি   লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াতের
কুষ্টিয়ার ৪টি আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বিএনপি-জামায়াতের

বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়ার চারটি সংসদীয় আসনেই এবার জামায়াতের প্রার্থীদের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সাধারণ ভোটাররা। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের নির্বাচনগুলোর বাইরে কুষ্টিয়ায় বিএনপির রাজনৈতিক শক্ত বলয় দীর্ঘদিন ধরেই অটুট ছিল। এর ধারাবাহিকতায় অতীতের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে এই জেলার চারটি আসনেই বিএনপির একক আধিপত্য দেখা গেছে।

তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জামায়াতের প্রার্থীদের টানা ও সংগঠিত প্রচারণায় বিএনপির প্রার্থীরা চাপের মুখে পড়েছেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এই নির্বাচনে নারী ভোটার ও নতুন ভোটারদের ভোটই বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন ভোটাররা যে দিকে ঝুঁকবে, তারাই জয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেবে; এমনটাই ধারণা সাধারণ মানুষের।

নির্বাচনী প্রচারণার একেবারে শেষপর্যায়ে এসে বিএনপি ও জামায়াত মুখোমুখি অবস্থানে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে। তবে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জেলার সর্বত্র মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও উদ্দীপনা রয়েছে। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও স্বস্তিতে রয়েছেন। উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া এখন পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় আছে।

চরমপন্থী অধ্যুষিত কুষ্টিয়ার চারটি আসনে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের ভোটের মাঠে কাজে লাগানোর অভিযোগ তুলেছে জামায়াত। ইতোমধ্যে জেলার সব উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। অন্য দিকে জামায়াত নিয়মিত নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা বিএনপির সদস্যসচিব ও কুষ্টিয়া সদর আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার। আবার জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, বিএনপির নেতাকর্মীরা মারমুখী আচরণ করছে এবং নারী ভোটারদের প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। কয়েকটি স্থানে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হলেও জেলার নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে স্থানীয়রা মোটামুটি সন্তুষ্ট বলেই জানিয়েছেন।

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন : এখানে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর এই আসনে বিএনপি চারবার জয়ী হয়েছে। জাতীয় পার্টি একবার এবং বাকি সময়গুলোতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। একটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪ হাজার ৫০৪ জন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল ৩ লাখ ৮০ হাজার ২৮৭ জন, অর্থাৎ ভোটার বেড়েছে ২৪ হাজার ২১৭ জন। সাধারণ মানুষের ধারণা, এই আসনে বিপুল ভোটে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য রেজাই আহমেদ বাচ্ছু মোল্লা এগিয়ে রয়েছেন। তবে গত এক বছর ধরে জামায়াতের প্রার্থী উপাধ্যক্ষ বেলাল হোসেন মাঠে সক্রিয়। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাইছেন। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নুরুজ্জামান হাবলু মোল্লার উপস্থিতিও ভোটের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

কুষ্টিয়া-২ (ভেড়ামারা-মিরপুর) আসন : আসনটিও বিএনপির ঘাঁটি হলেও সাংগঠনিকভাবে জামায়াত এখানে বরাবরই শক্ত অবস্থানে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এই আসনে জামায়াত একবার জয়ী হয়েছিল। এবারে জামায়াতের প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুল গফুর, যিনি দীর্ঘদিন ইউপি চেয়ারম্যান এবং একবার মিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। বিএনপির নতুন প্রার্থী ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী। সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম মনোনয়ন না পাওয়ায় দলের ভেতরে কিছুটা কোন্দল থাকলেও তিনি প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, কুষ্টিয়ার অন্য আসনগুলোতে ফল যাই হোক, এই আসনে জামায়াতের সম্ভাবনা বেশি। এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৮ হাজার।

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসন : এ আসনে লড়াই সবচেয়ে জটিল। অতীতে বিএনপি চারবার জয় পেলেও জামায়াত কখনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পারেনি। তবে উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতের চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ায় দলটির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এবারে ভোটার সংখ্যা চার লাখ ৪০ হাজার ৬০০ জন। জামায়াত প্রার্থী মুফতি আমির হামজা নির্ঘুম প্রচারণা চালাচ্ছেন। বড় বড় শোডাউন ও পৃথক নারী-পুরুষ মিছিল এলাকায় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকারও প্রচারণায় সরব। ব্যক্তিগত প্রচারণার ধরন ভোটারদের দৃষ্টি কেড়েছে। উভয় দলই এখানে জয় নিয়ে আশাবাদী।

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসন : আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আনোয়ার হোসেনও আলোচনায় রয়েছেন। বিএনপির প্রার্থী সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী শক্ত অবস্থানে। জামায়াতের প্রার্থী আবজাল হোসেন নতুন হলেও আগে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। স্থানীয়দের মতে, কারিগর সম্প্রদায়ের বড় অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত মূল লড়াই হবে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষ প্রতীকের মধ্যে।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে উভয় দলই শঙ্কা প্রকাশ করেছে। জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক সুজাউদ্দিন জোয়ার্দার অভিযোগ করে বলেন, ভোটের দিন কেন্দ্র দখল ও অরাজকতার চেষ্টা হতে পারে। অন্য দিকে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, জামায়াত আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। তার দাবি, কুষ্টিয়ার মানুষ বরাবরই জাতীয়তাবাদী শক্তির পক্ষে।