- গঠনতন্ত্রই চূড়ান্ত হয়নি ৩ মাসে
- স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ কয়েকজনের বিরুদ্ধে
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত হয়েছে ছাত্র-জনতার নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে প্রতিষ্ঠার পরপরই দলটি ঘিরে সারা দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশার বলয় তৈরি হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী অবস্থায় দেশের মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে দেশকে একটি নতুন বন্দোবস্তের দিকে ধাবিত করার কথা ছিল। দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম লক্ষ্যই ছিল সংস্কারের দাবিতে সরব থাকা এবং সংস্কারের বার্তা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু প্রতিষ্ঠার তিন মাসের মধ্যেই দলটিতে নেমে এসেছে এক ধরনের হতাশা। যে উদ্যম নিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা কাজ শুরু করেছিলেন তারা যেন তাদের উদ্যম হারিয়ে ফেলছেন। দলটির বেশ কিছু কার্যক্রম ও একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার ফলে তৈরি হয়েছে বিতর্ক ও চরম অসন্তোষ। দলীয় কার্যক্রমেও নেমে এসেছে ধীরগতি। এসবের পেছনে কারণ হিসেবে দলটির নেতৃত্বের অনভিজ্ঞতাকেও দায়ী করছেন রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা। গত বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস পদত্যাগ করতে চাইলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আরো বেড়ে যায়। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের অভ্যন্তরের অসন্তোষ নিয়েও বিভিন্ন জনকে পোস্ট করতে দেখা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির নেতাকর্মীরা জানান, দল হিসেবে এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রতিষ্ঠা পায়নি এনসিপি। এর জন্য আরো কিছু সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু ড. ইউনূস যদি অভ্যুত্থানের নেতাদের সাথে রাগ করে চলে যান তাহলে এই দলটি আর কোনোভাবেই দাঁড়াতে পারবে না। সে জন্য দলটির নেতাদের উচিত সংযত এবং পূর্ণ বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ করা। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য না থাকলে হয়তো ড. ইউনূস সত্যিই চলে যাবেন।
এনসিপির ভালোভাবে দাঁড়াতে না পারার পেছনে বেশ কয়েকজন নেতার স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও আছে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘ভাই-ব্রাদার’ সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে দলটি। দলের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের প্রায় সব কিছুই এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে। এই সিন্ডিকেটের নেতা এবং তাদের কাছের লোকজনের কারো কারো ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার উপরে দলের নীতিও নির্ধারণ হয়ে থাকে। দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটা অংশ দেশ এবং বিদেশ থেকে তাদের প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার প্রত্যয় নিয়ে এই দলে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের পূর্ণ চর্চা না থাকা এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনীতির প্রতিষ্ঠিত বাজে ধারার কারণে তারাও অনেকটা উদ্যম হারিয়ে ফেলছেন। যদিও ড. ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন ওঠার পর থেকে ব্যক্তির আদর্শ, সম্মান ও আবেগের চেয়ে দেশ এবং দেশের স্বার্থকে বড় বলে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে দলটির শীর্ষ নেতাদের। কিন্তু তাতেও সন্তুষ্ট নন দলটির অন্য নেতারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতার দাবি, দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা চালু করার জন্য শুধু মুখের বুলি নয় বরং সুনির্দিষ্ট নিয়ম চালু করতে হবে। অন্যথায় আবারো সেই পুরাতন প্রথার রাজনীতিতেই আমরা ফিরে যাবো। নতুন বন্দোবস্তের কথা তখন শুধু কাগজে কলমে আর পাঠচক্রের বক্তৃতায়ই সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রকৃতপক্ষে নতুন বন্দোবস্তের দেখা আমরা পাবো না।
গত কয়েক দিন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের হতাশা ও অসন্তোষের পেছনে আরো একটি বড় কারণ হলো দলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তের কোনো দ্রুত অগ্রগতি না হওয়া। দলের ভেতরের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করতে ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একটি শৃঙ্খলা কমিটি গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একজনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পেরেছে ওই কমিটি। সেটিও শুধুমাত্র সাময়িক বহিষ্কারে সীমাবদ্ধ। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুধুমাত্র কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে কমিটি। ওই বিষয়ে পরবর্তীতে আর কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিতে দেখা যায়নি। শাস্তির নিশ্চয়তা না থাকায় দলের ‘সুযোগসন্ধানী’রা দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্মেও জড়িয়ে যাচ্ছেন। এ কারণে দলের ভেতরে ও বাইরেও এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে।
এনসিপি প্রতিষ্ঠার পর খুব দ্রুতই তাদের গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কথা ছিল। এ উপলক্ষে প্রস্তুতি কমিটিসহ নানা ধরনের কমিটিও করা হয়েছিল। কিন্তু তিন মাসেও দলটি এখনো তাদের গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করতে পারেনি। আদৌ তাদের দল কিভাবে চলবে এবং কোন কোন নীতির ওপর তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপ্রণালী প্রণীত হবে তার কোনো কিছু না জেনেই অনেকটা আন্দাজেই কাজ করে যাচ্ছেন তৃণমূলের কর্মীরা। গত ঈদুল ফিতরের পরপরই জেলা ও উপজেলা কমিটিগুলো করে ফেলার কথা জোর দিয়ে বললেও সেই ঘোষণার পর পেরিয়ে গেছে আরো প্রায় দেড় মাস। কিন্তু এখনো কোনো জেলা কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। যদিও জেলা কমিটি গঠনের ব্যাপারে অগ্রগতির জন্য দলটি তাদের পুরো বাংলাদেশকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করে প্রস্তুতি কমিটি করেছে। কিন্তু সেই অনুুপাতে এখনো কাজের অগ্রগতি একেবারে শূন্যের কোঠায়। কেন্দ্রীয় নেতারা বিভিন্ন জেলা সফর করা শুরু করলেও তাদের কাজের অগ্রগতি নিয়েও অসন্তোষ আছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের নামে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও কার্যত দুই মহানগরের কোনো কমিটি বা সাংগঠনিক ভিত্তি এখনো দলটি দাঁড় করাতে পারেনি।
তিন মাস পার হয়ে গেলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির নিজস্ব কোনো অফিস নেই। নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সবার আগে প্রয়োজন দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন। কিন্তু নিবন্ধন পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত আছে তার বেশির ভাগই এখনো পূরণ করতে পারেনি দলটি। নির্বাচন কমিশনের কাছে তারা সময় প্রার্থনা করলে নির্বাচন কমিশন সেটি আমলে নিয়ে সময় বৃদ্ধিও করেছে। কিন্তু সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নিয়ে সৃষ্টি হওয়া ঝামেলার প্রেক্ষিতে তারা নির্বাচন কমিশন বাতিলের দাবিতে আন্দোলনও করেছে। ফলে ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে দল হিসেবে অংশগ্রহণ করা নিয়ে শঙ্কাও আছে দলটির। এ কারণে গত ঈদুল ফিতরে এনসিপির যেসব নেতাকর্মী নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন, তাদের মধ্যেও চরম হতাশা ভর করেছে। আবার দলের বার্তা নিয়ে দেশব্যাপী নেতাকর্মীদের চষে বেড়ানোর কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তৃণমূলে হাতেগোনা কয়েকটি জেলা শহরের বাইরে এনসিপির কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি লক্ষ করা যায়নি। জানা গেছে, দেশের অধিকাংশ জেলা শহর বা উপজেলা, গ্রামপর্যায়ে বেশির ভাগ মানুষ এখনো দলটি সম্বন্ধে কোনো কিছুই জানেন না। এটি অনেকটা ঢাকাকেন্দ্রিক দলে পরিণত হচ্ছে। তবে ঢাকার কার্যক্রমেও জনসম্পৃক্ততা নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন।
তবে সামনের দিনে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে, হতাশা ঝেড়ে ফেলে আরো ভালোভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশব্যাপী দলের বার্তা পৌঁছে দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এনসিপি শীর্ষ নেতারা। এ ব্যাপারে দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, চব্বিশের ৭ জানুয়ারির পূর্বের মার্কিন স্যাংশনপন্থী রাজনীতি বাংলাদেশে ব্যর্থ হয়েছিল। ছাত্রদের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণ জানুয়ারির ওই রেজিম চেঞ্জ প্যারাডাইমকে প্রত্যাখ্যান করে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্যারাডাইম সৃষ্টি করেছে। ২৫ সালে ভিন্ন মোড়কে শুরু হওয়া দিল্লিপন্থী স্ট্যাটাস-কো অক্ষুণ্ন রাখার রাজনীতিও ব্যর্থ হবে। এবারো জনগণ মৌলিক সংস্কারের মাধ্যমে স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের রাজনীতিকে জয়ী করবে।



