সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভয়ঙ্কর শিশু সিন্ডিকেট

দিনে ফুল বেচে, রাতে মাদকের বাহক

Printed Edition

হারুন ইসলাম

দিনের বেলা প্রখর রোদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় গেলে পাওয়া যায় ১০ বছর বয়সী রাকিবের (ছদ্মনাম)। ছোট কাঁধে পানির বোতল নিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে সে, আর তার সাথেই থাকা ছোট বোনটি পথচারীদের হাতে তুলে দেয় গোলাপ ফুল। দূর থেকে দেখলে এটি কেবলই বেঁচে থাকার এক সাধারণ সংগ্রাম মনে হতে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই এই শিশুদের জীবনের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। তাদের ছোট ছোট হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় গাঁজা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মরণনেশার কাগজের পুড়িয়া।

ঠিক একই রকম নির্মম নিয়তির শিকার ১০ বছর বয়সী আরেক শিশু সাদিক (ছদ্মনাম)। শৈশবে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারানোর পর বেঁচে থাকার তাগিদে ক্র্যাচে ভর করে টিএসসি এলাকায় ফুল বিক্রি করত সে। কিন্তু পরিবার যখন অভাবের তাড়নায় দিশেহারা, তখন তার মা তাকে আরো ভালো আয়ের আশায় আবারো এই পার্কে নিয়ে আসেন। সাদিক সেখানে ফুল নয়, মাদক বিক্রি করে।

দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে একদল পথশিশুকে এভাবেই অপরাধ জগতের অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে সংঘবদ্ধ মাদক সিন্ডিকেট।

কেন শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে সিন্ডিকেট?

ঢাবি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় পুলিশের টহল ও নজরদারি আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। আর পুলিশের এই নজরদারি ফাঁকি দিতেই কৌশল বদলেছে মাদক কারবারিরা। বয়সে ছোট হওয়ায় শিশুরা সহজেই পুলিশের তল্লাশি বা সন্দেহের বাইরে থাকে। সিন্ডিকেট মাত্র কয়েক টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মাদক সরবরাহের ‘কুরিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে।

আইনি কাঠামোর দুর্বলতাও এই অপরাধীদের বড় হাতিয়ার। শাহবাগ থানা পুলিশের এক কর্মকর্তার মতে, সাধারণত ৮ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের এই চক্রে বেশি ব্যবহার করা হয়, কারণ দারিদ্র্যের পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়াও এর জন্য দায়ী। শিশুদের েেত্র আইন ভিন্নভাবে কাজ করে; অভিযানে আটক হওয়ার পরও শিশু আইনের কারণে তারা দ্রুত ছাড়া পেয়ে যায়। ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শিশুদের মামলা ও তদন্ত আলাদাভাবে পরিচালিত হয় এবং তাদের আদালতে পাঠানো হলে আদালত সহজে মুক্তি বা জামিন দেন।

এই পুড়িয়া কোথা থেকে আসে, তা জানতে চাইলে শিশু রাকিবের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নিচু স্বরে অত্যন্ত ভয়ে সে বলে, “কয়েকজন লোক আছে, তারা আইসা দিয়া যায়। এর বেশি কিছু কওন যাইব না, মানা আছে। কইলে মাইর দিব।” রাকিবের এই ছোট্ট ও ভীত কণ্ঠস্বর প্রমাণ করে, শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহারের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে শক্তিশালী ও সংগঠিত মাদক সিন্ডিকেট।

উদ্যানের ভাসমান ‘পরিবার’ ও সিন্ডিকেটের অন্দরমহল

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বসবাসকারী ভাসমান মানুষের কাছে এটি নিছক কোনো পার্ক নয়, বরং একটি স্থায়ী ঠিকানা। অনেকেই এখানে জন্মগ্রহণ করেছে, বেড়ে উঠেছে এবং এখানেই বিয়ে ও মৃত্যুর সাী হয়েছে; তারা নিজেদের একটি ‘পরিবার’ হিসেবে পরিচয় দেয়। স্মৃতি ও আকাশ এমনই এক দম্পতি, যারা পার্কে বসবাস করার সময়ই বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হয়। আকাশ সেখানে প্রায় ১২ বছর ধরে আছে, আর স্মৃতি সেখানে বসবাস করছে দীর্ঘ তিন দশক ধরে। স্মৃতি একসময় ফুল বিক্রি করলেও পরে সে গাঁজা বিক্রির সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং জানায়, দিনে তারা প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাভ করে। তবে সে এও স্বীকার করে যে, সে সব সময়ই ভয়ে ভয়ে এই মাদক বিক্রি করে।

পার্কের ভেতরের ‘ফাওয়ার ক্যান্টিন’ বা ফুলের ক্যান্টিন নামে পরিচিত একটি স্থানে প্রকাশ্যে চলে এসব আড্ডা। সেখানে প্রায় ১০-১২ জনকে একসাথে বসে আড্ডা দিতে এবং শিশুদের সাথে সময় কাটাতে দেখা যায়। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পারুলী নামের এক নারী আগে ফুল ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকলেও পরে নবী নামের এক ব্যক্তি অনেককে মাদক ব্যবসায় নিয়ে আসে। একসময় শহীদ মিনার থেকে খিচুড়ি পট্টি পর্যন্ত এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করত মেহেদীর মা, যাকে সবাই ‘মুক্তা খালা’ নামে চিনত। বর্তমানে নবী, অলিকা, রেখা খালা ও রাব্বির দলগুলো সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। এই মাদক ব্যবসায় পাঁচ বছর ধরে জড়িত হুমায়ুন এর কার্যক্রমকে ‘অত্যন্ত সুসংগঠিত’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, মানুষ ধাপে ধাপে এই ব্যবসায় প্রবেশ করে; প্রথমে নতুনরা ছোটখাটো কাজ করে, পরে বড় ডিলারদের কাছাকাছি যায় এবং এরপর শুরু হয় নিয়ন্ত্রণের লড়াই। যখন পুলিশের অভিযানের খবর আসে, বিক্রেতারা দ্রুত ভিড়ের মধ্যে মিশে যায় এবং গাঁজার প্যাকেট ছুড়ে ফেলে বা কাপড়ের গোপন পকেটে লুকিয়ে রাখে।

সাম্য হত্যাকাণ্ড মাদক ও ভবঘুরেদের এই দৌরাত্ম্য যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে গত বছরের ১৩ মে। ওই রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় মোটরসাইকেলের সামান্য ধাক্কা লাগাকে কেন্দ্র করে মাদকসেবীদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে খুন হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য। সাম্য নিহত হওয়ার পর মেহেদীর দলের অনেক সদস্য, যার মধ্যে কপোত আব্বু, আবু, রিপন ও মকবুল গ্রেফতার হয়েছিল, যার ফলে তাদের কার্যক্রম এখন আর আগের মতো নেই বলে জানান স্থানীয়রা।

খোদ প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ভয়ঙ্কর বাণিজ্য চললেও তা বন্ধে কার্যকর পদপে না থাকায় সাধারণ শিার্থীরা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ক্যাম্পাসে রাত বাড়ার সাথে সাথে মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের উৎপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বিশেষ করে নারী শিার্থীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ঢাবির শিার্থী আফরিন জাহান নিজের এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, কিছুদিন আগে রাতে টিউশন শেষে হলে ফেরার পথে দোয়েল চত্বরে এক নেশাগ্রস্ত ভবঘুরে তার পথ আটকে দাঁড়ায়। তিনি ভয়ে চিৎকার দিলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসে এবং ওই ভবঘুরে পালিয়ে যায়।

প্রশাসনের ‘বিশ্বকাপ’ অজুহাত ও পুলিশের ভাষ্য

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সাম্য হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসেছিল। টিএসসি-সংলগ্ন উদ্যানের কয়েকটি প্রবেশপথ ইটের গাঁথুনি দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় এবং পুলিশি অভিযান জোরদার করা হয়। কিন্তু সেই তৎপরতা ছিল কেবলই সাময়িক। সরেজমিনে দেখা যায়, রমনা কালীমন্দির গেটের পাশে তিন নেতার মাজারসংলগ্ন এলাকায় উচ্ছেদ হওয়া ঝুপড়িগুলো আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এবং রাত বাড়লেই বসছে মাদকের জমজমাট আসর।

শিার্থীদের দাবি, কেবল লোকদেখানো টহল নয়, মাদকের মূল উৎস ও সিন্ডিকেট সমূলে উৎপাটন করতে হবে। তবে ক্যাম্পাসের নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাবির সহকারী প্রক্টর রফিকুল ইসলাম কিছুটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ চলাকালে ক্যাম্পাসে খেলা দেখতে অনেক মানুষ আসায় ভবঘুরে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা কিছুটা বেড়েছে। সব সময় কঠোর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না।’এ ছাড়া প্রক্টোরিয়াল টিমের লোকবল সীমিত হওয়ায় পুরো এলাকায় একসাথে নজরদারি করা কঠিন জানিয়ে তিনি দ্রুতই কঠোর অবস্থানে যাওয়ার আশ্বাস দেন।

অন্য দিকে শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো: আল আমিন বলেন, ‘মাদকসেবীদের উৎপাতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে আসছি। তিন নেতার মাজারসংলগ্ন এলাকা সিলগালা করা হয়েছে। এরপরও বিচ্ছিন্নভাবে কেউ সেখানে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বিষয়টিকে কেবল মাদকের সমস্যা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর শিশু সুরার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত। শিশুদের স্বাস্থ্য, শিা, পুষ্টি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উচিত। তাদের মতে, পথশিশুদের এই অস্তিত্ব সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যকার সঙ্কটেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। একজন পথশিশু কোনো স্বাভাবিক পরিচয় নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যর্থতার প্রকাশ। সরকারি এতিমখানা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন শিশুরা রাস্তায় থাকছে এমন প্রশ্ন তুলে তারা এই শিশুদের বাধ্যতামূলক শিা, বোর্ডিং স্কুল, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার ওপর জোর দেন।

প্রশাসনের আশ্বাস ও অজুহাতের মাঝেই প্রতিদিন ঢাবি ক্যাম্পাসে অন্ধকার নামলে ফুলের বদলে পথশিশুদের হাতে উঠছে মাদক। এই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে ভবিষ্যতে হয়তো সামীর মতো আরো অনেককেই অকালে প্রাণ হারাতে হবে। আর সাদিকের মতো হাজারো শিশুর কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান একই সাথে বাড়ি এবং কর্মত্রে হয়েই থাকবে এমন একটি জায়গা যেখানে শৈশবের আগেই শুরু হয়ে যায় বেঁচে থাকার এক নির্মম ও অন্ধকার লড়াই।