রফিকুল ইসলাম রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)
উপকূলীয় এলাকায় ঝড় ও সাইক্লোন মানেই সাধারণ মানুষের চোখে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ। ট্রলারডুবি, প্রাণহানি, ফসলিজমি ও ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার বেদনাদায়ক স্মৃতি ভাসে ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে। সিডর ও আইলার ধ্বংসও আজও ভুলতে পারেনি উপকূলবাসী। অথচ সেই ঝড়ই অনেক সময় সাগরপাড়ের জেলেদের জন্য হয়ে ওঠে যেন এক অদ্ভুত আশীর্বাদ। ঝড় ও ভারী বৃষ্টির পর উত্তাল সাগর আর নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ, বিশেষ করে রূপালি ইলিশ।
সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বর মাসজুড়ে সাগরে একাধিক নিম্নচাপ ও দুর্যোগ সৃষ্টি হয়। এতে এক দিকে উপকূলজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি বাড়লেও অন্য দিকে জেলেদের মৌসুমি আয় ভালো হয়। তবে চলতি বছর উল্লেখযোগ্য কোনো ঝড় বা ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পরিস্থিতি উল্টো। দুর্যোগ না থাকায় উপকূলীয় জনজীবন এখন পর্যন্ত নিরাপদ থাকলেও জেলেদের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। প্রত্যাশামতো মাছ মিলছে না নদী ও সাগরে কমে গেছে আয়।
সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া গিয়াসউদ্দিন মাঝি বলেন, প্রতি বছর এ সময় ঝড়বৃষ্টি হয়। তখন নদী আর সাগর উত্তাল থাকে, জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ওঠে। এ বছর ঝড় হয়নি, তাই মাছও কম। আল-আমিন মাঝির মন্তব্য, ঝড়বৃষ্টি আমাদের জন্য আশীর্বাদের মতো। যদিও বড় ঝড়ে প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে, তবুও ভালো মাছের আশায় সেই ভয় উপেক্ষা করেই সাগরে যেতে হয়। এই মৌসুমে স্বাভাবিকভাবে উপকূলীয় নদ-নদীতে ইলিশ ওঠার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জাল ফেলেও জেলেরা মিলছে না কাক্সিক্ষত ধরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বৃষ্টিপাত ও পানির স্রোত নির্ভর ইলিশের প্রজনন ও চলাচল। বৃষ্টি কম হলে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়, ফলে ইলিশ নদীমুখী হতে পারে না। এ বছরের কম বৃষ্টিই মূল সমস্যার অন্যতম কারণ।
রাঙ্গাবালী উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুনবি জানান, সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরে বজ্রপাতসহ প্রচুর বৃষ্টি হয়, যা মাছের প্রজননের জন্য অনুকূল। এ বছর তেমন প্রতিকূল আবহাওয়া না থাকায় ইলিশসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন কমছে। ঘূর্ণিঝড় কৃষির জন্য হুমকি হলেও জেলেদের জন্য তা অনেক সময় আশীর্বাদ।
এ দিকে নদীতে মাছ কম ধরার পেছনে আরো কারণ কাজ করছে। কম বৃষ্টির সাথে যুক্ত হয়েছে নদ-নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, দূষণ ও অবৈধ জাল স্থাপন। সাগর মোহনা থেকে নদী পর্যন্ত ছোট ফাঁসের চরঘেরা বেহুন্দি ও মশারি জাল দিয়ে পথ রুদ্ধ করায় সাগর থেকে নদীতে মাছের স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রজনন মৌসুমেও নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ উঠছে না।
একসময় জেলেরা জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে ইলিশের প্রধান মৌসুম ভাবতেন। এখন সেই হিসাব পাল্টে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষার সময় সরেছে। আগে আষাঢ়-শ্রাবণে প্রবল বর্ষা হতো, এখন তা অনেক সময় আগস্ট-সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবর পর্যন্ত গড়ায়। ইলিশের জীবনচক্র বর্ষার ওপর নির্ভর করায় মৌসুমও সরে গেছে। মা ইলিশ রক্ষা ও ডিম ছাড়ার ব্যবস্থাপনায় উন্নতি হওয়ায় এখন প্রায় সারা বছরই ইলিশ মিলছে, তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরকে ধরা হচ্ছে মূল মৌসুম এবং জুন-জুলাইকে ‘ডাল সিজন’।



