একটি দেশকে খুশি করতে জুলাই জাদুঘরের অনেক স্মৃতি গায়েব করা হয়েছে : ডা: শফিক

Printed Edition
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাতীয় সিরাত উদযাপন কমিটি আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে জাতীয় সিরাত উদযাপন কমিটি আয়োজিত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয়, এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি; যার ভেতরে এটি প্রবেশ করে, সে-ই ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের রাস্তায় বাংলাদেশের মানুষ আর কাউকে চলতে দেবে না। ২০২৪ সালে যেই মানুষগুলো জেগে ওঠেছে তারা সবাই মরে যায়নি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষ বারবার গর্জে উঠবে। ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই চলবে।

গতকাল রোববার ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় সিরাত উদযাপন কমিটির আয়োজনে সিরাতুন্নবী সা: উপলক্ষে ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাসূল সা:-এর নীতি ও আদর্শ’ শীর্ষক সেমিনার ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, ইসলাম শান্তি ঐক্য ও সমন্বয়ের ধর্ম। কুরআনের শাসন যখন যেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখনই মানুষ শান্তি ও শৃঙ্খলা পেয়েছে। তিনি বলেন, আগামীর বাংলাদেশ হবে ইসলামের বাংলাদেশ।

জুলাই জাদুঘর কেবলমাত্র পতিত সরকারের ডামি রূপ উল্লেখ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাস্তবে তারচেয়ে বহুগুণ বেশি জুলুম জাতির ওপর করা হয়েছে। বিশেষ একটি দেশকে খুশি করতে ওই জুলুমের অনেক তথ্য গায়েব করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ও উপাদান গায়েব করে দেয়া হয়েছে। সীমান্তে ফেলানীকে হত্যা করে কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখার সেই বর্বরোচিত ছবি জুলাই জাদুঘর থেকে গায়েব করে দেয়া হয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে রিমান্ডের নামে অমানবিক পৈশাচিক যেই নির্যাতন করা হয়েছে সেই নির্যাতনের ছবিও গায়েব করা হয়েছে। অথচ দেলাওয়ার হোসেনের ওপর চালানো অমানবিক পৈশাচিক নির্যাতনের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আরো বলেন, ক্ষমতায় যারাই আসে তারা বলে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে কিন্তু তারা প্রত্যেককেই ইতিহাস বিকৃত করেছে এবং করছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০২৪ সালের ছাত্রজনতার বিপ্লবকে যেন কেউ ‘ফাইনাল যুদ্ধ’ বলে মনে না করে। চব্বিশের আন্দোলন ছিল শুধুই একটি ‘রিহার্সেল’। চব্বিশের জেগে ওঠা মুক্তিকামী মানুষ মরেনি, তারা এখনো সজাগ দৃষ্টিতে দেশের সব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

প্রধান আলোচকের বক্তব্যে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শ জনগণের মধ্যে পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের দেশের সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে গেলে ইজ্জত পাওয়া যায় না। এর অন্যতম কারণ আমরা একদেশে ঢুকতে পারলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে আরেক দেশে ঢুকে যাই। কারণ আমাদের নৈতিক আদর্শ নেই। নৈতিক আদর্শ গঠনের জন্য মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ একদিন সিরাতের আদর্শে পরিচালিত হবে। তিনি আরো বলেন, এদেশে ৫৪ বছরের ইতিহাসে অনেকে শহীদ হয়েছেন। শহীদদের রক্তের বাংলাদেশে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ করতে তৈরি থাকতে তিনি দেশবাসীকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আ ন ম রফিকুর রহমান মাদানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, কুরআনে আল্লাহ নিজে বলেছেন সমস্ত মানব রচিত আদর্শের বিপরীত আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একমাত্র রাসূল সা:-এর নীতি ও আদর্শকে জীবন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, মদিনা সনদে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নেই। কিন্তু যারা মদিনা সনদে দেশ পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে দুর্নীতি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি দেখা যায়।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারে মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শ বর্তমান সময়ে খুবই প্রাসঙ্গিক। সুখী-সমৃদ্ধ, মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শ অনুসরণে বিক্রি নেই। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দেশ বারবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ান হয়েছে। এই ৫৫ বছরে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনেরা দলীয়করণের মাধ্যমে জনগণকে শোষণ করেছে। তাদের স্বার্থের জন্য জনগণের ওপর স্টিমরোলার চালিয়েছে। কিন্তু যখন তারা বিরোধী দলে থাকে তখন ইনসাফ ও ন্যায়ের বাণী শোনায়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে তারা ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে জালিমের রূপে আবিভূত হয়। যদি মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় তবে কোনো দল বা কোনো সরকার জালিম হতে পারবে না, ফ্যাসিস্ট হতে পারবে না, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। ফলে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, বিএনপি সরকার সংস্কার চায় না। তারা আগের ফ্যাসিবাদী সরকারের নীতি ও আদর্শকে সংশোধন করে নিজেদের মতো করে আরো পাকাপোক্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি আরো বলেন, ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র ছাড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে না। একজন ইসলামী দলগুলোর নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে।

জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি বলেন, পাঁচ বছর পর পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মদিনা সনদে দেশ পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি জাতিকে দিয়ে থাকে। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে বলে আমরা মধ্যযুগে ফিরে যেতে চাই না! যারা রাসূল সা: নীতি ও আদর্শকে মধ্যযুগীয় বলে তাদের কাছে ইসলামের আদর্শ অনুপস্থিত। যারা নির্বাচনের আগে মদিনা সনদের দেশ পরিচালনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর মদিনা সনদকে মধ্যযুগী কায়দা বলে তাদের দ্বিচারিতা জনগণ বোঝে গেছে। তিনি ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরে রাসূল সা:-এর নীতি ও আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।

মাওলানা রফিকুল ইসলাম মিয়াজী পরিচালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন জাতীয় সিীরাত উদযাপন কমিটির সমন্বয়ক ড. আব্দুল মান্নান। অনুষ্ঠিত সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. আ ক ম আবদুল কাদের। উত্থাপিত প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে বক্তব্য রাখেন ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ শামসুল আলম, তামীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল ড. খলিলুর রহমান মাদানী, ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন, শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম প্রমুখ। আরো বক্তব্য রাখেন সিরাতুন্নবী সা: মাহফিল উপলক্ষে অনুষ্ঠিত রচনা প্রতিযোগিতায় ক-গ্রুপে (শিক্ষার্থী) ১ম স্থান অর্জনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মুশফিকা সালসাবিল, খ-গ্রুপে (পেশাজীবী) ১ম স্থান অর্জনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রবিউল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য যথাক্রমে আব্দুস সালাম, ড. মোবারক হোসাইন, কামরুল আহসান হাসান, সৈয়দ সিরাজুল হক, শাহীন আহমেদ খান প্রমুখ।

সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. আ ন ম রফিকুর রহমান বলেন, রাসূল সা:-এর নীতি ও আদর্শ জীবনভর শুধু শুনে আসলেই এর সুফল পাওয়া যাবে না। সুফল পেতে হলে মহানবী সা:-এর নীতি ও আদর্শ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

সেমিনার শেষে, সিরাতুন্নবী সা:- উপলক্ষে রচনা প্রতিযোগিতা-২০২৪-এর দুই গ্রুপে অংশগ্রহণকারী বিজয়ী ২০ জনের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। জাতীয় সিরাত উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে উভয় গ্রুপের প্রথম বিজয়ীদের পুরস্কার ছিল নগদ ৫০ হাজার টাকা ও সম্মাননা ক্রেস্ট এবং ইসলামিক বই। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ডা: শফিকুর রহমান প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীদের জন্য নগদ ৫০ হাজার টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেন।