জসিম উদ্দিন রানা
হকির পৃথিবীতে বাংলাদেশের মেয়েরা এখনো শিশু। যেখানে এশিয়ার পরাশক্তিগুলোর মেয়েদের হাতে বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার ভার, সেখানে লাল-সবুজের মেয়েদের পথচলা যেন সবে হাঁটতে শেখা শিশুর মতো। অন্যদের যেখানে পরিপক্বতার গল্প, বাংলাদেশের সেখানে এখনো বেড়ে ওঠার গল্প। তবু সেই গল্পেই এখন লেখা হচ্ছে নতুন এক রূপকথা।
বাংলাদেশের নারী হকির হাতেখড়ি আশির দশকে। কিন্তু শুরুর সেই আলো বেশিদিন জ্বলেনি। অঙ্কুরেই ছন্দপতন, তার পর নেমে এসেছিল দীর্ঘ অন্ধকার। সম্ভাবনার যে চারাগাছটি একটু একটু করে মাথা তুলছিল, পরিচর্যার অভাবে সেটিই একসময় শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। কেটে গেছে একটি যুগ, তার পর আরেকটি যুগ। বাংলাদেশের নারী হকি যেন হারিয়ে গিয়েছিল সময়ের ধুলোয়।
দুই যুগ পর সেই অন্ধকারে আলো হাতে হাজির হলেন এক হকিপাগল মানুষ- তারিকুজ্জামান নান্নু। ভালোবাসা, স্বপ্ন আর একরাশ জেদ নিয়ে তিনি আবারো মেয়েদের হকির প্রদীপটি জ্বালানোর চেষ্টা করলেন। পথটা অবশ্য মসৃণ ছিল না। ছিল নানা চড়াই-উতরাই, সীমাবদ্ধতা, অনিশ্চয়তা। তবু থামেনি পথচলা। বাংলাদেশ হকি ফেডারেশন ও বিকেএসপির সহযোগিতায় ধীরে ধীরে সেই আলো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উঠে আসা মেয়েরা হাতে তুলে নেয় স্টিক। কারো চোখে ছিল জাতীয় দলের স্বপ্ন, কারো চোখে আন্তর্জাতিক মঞ্চে লাল-সবুজ জার্সি পরার আকাক্সক্ষা। সেই ছোট ছোট স্বপ্নই আজ একসাথে মিলে বড় ছবিতে পরিণত হয়েছে।
আর সেই ছবির সবচেয়ে উজ্জ্বল রঙ এখন জুনিয়র এশিয়া কাপ।
ছোট ছোট মেয়েরা যে এমন ধামাকা দিতে পারে, তা হয়তো অনেকেই ভাবেননি। প্রথম ম্যাচেই চায়নিজ তাইপেকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের আগমনী বার্তা দিয়েছিল আইরিন-রিয়ারা। এরপর পাকিস্তানকে ৫-১ গোলে হারিয়ে প্রমাণ করেছে, প্রথম জয় কোনো অঘটন ছিল না। আর গতকাল শক্তিশালী কাজাখস্তানের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় যেন সেই বিশ্বাসটাকেই আরো পোক্ত করে দিলো। ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে খেলে বাংলাদেশ দল। প্রথমার্ধেই ২-০ গোলে এগিয়ে যায় তারা। দলের পক্ষে ম্যাচের ৩ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে প্রথম গোল করেন শারিকা রিমন। ১৪ মিনিটে ফিল্ড গোল করে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন লিজা আক্তার। ৪৬ মিনিটে আবারও ফিল্ড গোল করে দলকে ৩-০ তে এগিয়ে দেন জাকিয়া আফরোজ লিমা। ৫১ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে ম্যাচের শেষ ও চতুর্থ গোলটি করেন অধিনায়ক শারিকা রিমন।
তিন ম্যাচে তিন জয়। গোল করেছে ১৬টি, হজম করেছে মাত্র একটি। হিসাবের খাতায় সংখ্যাগুলো যতটা চমকপ্রদ, তার চেয়েও বড় হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের উত্থান। এই জয়গুলো শুধু পয়েন্টের হিসাব নয়; এগুলো বাংলাদেশের নারী হকির বদলে যাওয়া গল্পের প্রতিচ্ছবি।
সেরা ছয়ে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। আজ গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় হংকং চায়নার মুখোমুখি হবে জাহিদ হোসেন রাজুর শিষ্যরা। ফলাফল যা-ই হোক, পরবর্তী রাউন্ডের সমীকরণে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। তাই আজকের ম্যাচটি হতে পারে নিজেদের আরো একটু পরখ করে নেয়ার সুযোগ।
তবে আসল পরীক্ষা অপেক্ষা করছে ১০ অক্টোবর। সামনে তখন জাপান। এলিট প্যানেলের ৩ নম্বর দল। সেই প্যানেলে আছে এশিয়ার হকির পাঁচ পরাশক্তি- ভারত, চীন, জাপান, কোরিয়া ও মালয়েশিয়া। তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের মেয়েদের লড়াইটা তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়; এটি হবে অভিজ্ঞতার সাথে তারুণ্যের, প্রতিষ্ঠিত শক্তির সাথে উঠে আসতে থাকা এক দলের পরীক্ষা। হয়তো জাপানের মেয়েরা এগিয়ে থাকবে অভিজ্ঞতায়, পরিপক্বতায়, আন্তর্জাতিক মঞ্চের পরিচয়ে। বাংলাদেশের মেয়েরা সেখানে পুঁচকে। কিন্তু খেলাধুলার সৌন্দর্য তো এখানেই- সব হিসাব মাঠে গিয়ে বদলে যেতে পারে।
যুবাদের প্রথম জয়
দুই ম্যাচ হারের পর কাজাখস্তানকে হারিয়ে জুনিয়র এশিয়া কাপ হকিতে বাংলাদেশের যুবাদের প্রথম জয়। বেঁচে রইল বিশ্বকাপে খেলার কিঞ্চিত স্বপ্ন। গতকাল টুর্নামেন্টে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে কাজাখস্তানের বিপক্ষে ৪-২ গোলের ব্যবধানে জয় তুলে নেয় লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। একটি করে গোল করেন শিমুল ইসলাম, মেহেদী হাসান অভি, তৈয়ব আলী ও মুন্না ইসলাম। আজ ম্যাচ পাকিস্তানের সাথে।



