নিজস্ব প্রতিবেদক
- সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে বহাল
- বিএনপি আমলেও পেয়েছেন পদোন্নতি, দুর্নীতির তথ্য দুদকে
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের নেতা খন্দকার মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ এই প্রকৌশলী বর্তমানে পদোন্নতি পেয়ে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।
তাকে বলা হতো আগের প্রশাসক এজাজের ‘ডান হাত’। বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীর ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ও দুই সিটি করপোরেশনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে ডিএনসিসির প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। খন্দকার মাহবুব তারও আস্থাভাজন হয়ে উঠেন। তাকে বলা হয় ডিএনসিসির ভাগ্যবান কর্মকর্তা। তিন সরকারের তিনজন মেয়র ও প্রশাসকের আনুকল্য পেয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বেপরোয়া। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা হওয়া একাধিক অভিযোগ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রশাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো থেকে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। প্রশাসনের সর্বস্তরে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার নীতির কথা সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে জানানো হলেও ডিএনসিসির ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টো। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) খন্দকার মাহবুবের অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রকল্পের কাজ বিতর্কিত ফ্যাসিবাদের দোসরদের মধ্যে বিলি বণ্টন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নানা প্রশ্ন থাকলেও তিনি এখনো রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে।
খন্দকার মাহবুব সম্পর্কে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলামের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তার দুর্নীতির বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন তিনি। আতিকুল ইসলাম মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সময় মাহবুব ডিএনসিসির অঞ্চল-৩ নির্বাহী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব নেন। পরে ডিএনসিসির ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেলে প্রথমে ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) পদে দায়িত্ব দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) পদে পদোন্নতি পান। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ ডিএনসিসিতে মাহবুবকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ডিএনসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবদুল হাই স্বাক্ষরিত একটি আদেশে খন্দকার মাহবুব আলমকে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের জন্য ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ওই সময় তিনি প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনসংক্রান্ত কার্যক্রম সমন্বয়কের দায়িত্ব পান।
এর আগে ২০২৪ সালের ৯ মে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান খন্দকার মাহবুব আলম। এটি আওয়ামী লীগপন্থী পেশাজীবী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। ফলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও এমন ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পদের পাহাড় : অভিযোগ অনুযায়ী খন্দকার মাহবুব দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের যোগসাজসে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাতটি ফ্ল্যাট ও বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। আছে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি। এ ছাড়া তার একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে সাজানো হয়েছে বলে আলোচনা রয়েছে।
প্রকল্পে অনিয়ম : আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত ডিআরএসপি প্রকল্পের প্রায় ৮২২ কোটি টাকার কাজের মধ্যে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয় আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারকে।
বর্তমানে খন্দকার মাহবুব ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সংস্থার প্রকৌশল বিভাগের বড় প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
ডিএনসিসির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সাথেও খন্দকার মাহবুবের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর পদে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং টেন্ডার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার প্রভাব বেড়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে খন্দকার মাহবুব আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি সরকারি চাকরি করি। যখন যে মেয়র বা প্রশাসক এসেছে তার সাথে কাজ করেছি। আমার সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কেউ কেউ অপপ্রচার করছে। বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করা ও বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকীর ফোকাল পয়েন্ট থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। তার দাবি ওই সময় সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।


