কাওসার আজম সিরাজগঞ্জ থেকে ফিরে
কৃষিতে নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে উন্নতজাতের বারি সরিষা-২০। স্বল্প জীবনকাল, উচ্চফলন, তেলের পরিমাণ বেশি এবং খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল এই জাত ইতোমধ্যে কৃষকদের আস্থা অর্জন করতে শুরু করেছে। আমন ধান কাটার পর বোরো ধানের আগের স্বল্প সময়ে পতিত পড়ে থাকা জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে প্রথমবারের মতো সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার যমুনার চর পূর্ব মোহনপুর গ্রামে একসাথে ১০০ বিঘা জমিতে এই সরিষার প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এর সাফল্য তেলজাতীয় ফসলের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে নতুন গতি দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার সয়দাবাদ ইউনিয়নের যমুনার চর পূর্ব মোহনপুর গ্রামে পার্টনার প্রকল্পের সহায়তায় উন্নতজাতের বারি সরিষা-২০-এর আবাদ করেছেন ৩৫ জন কৃষক। চরাঞ্চলের যে জমিগুলো বছরের বড় একটি সময় পতিত থাকে, সেসব জমি উৎপাদনের আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সরেজমিন গবেষণা বিভাগের পাবনা কার্যালয়ের সায়েন্টিফিক অ্যাসিস্ট্যান্ট সিরাজুল ইসলাম জানান, বারি সরিষা-২০ একটি স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল জাত। যমুনা নদীর চরে পার্টনার প্রকল্পের (বারি অঙ্গ) আওতায় এটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। পাইলট প্রডাকশন হিসেবে ১০০ বিঘা জমিতে কৃষকদের সার, বীজ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যেই এই সরিষা হার্ভেস্ট করা যাবে। হার্ভেস্টের পরপরই বোরো ধান চাষে যাওয়া সম্ভব হবে। এতে একই জমিতে তিন ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।’
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত টনি-৭ জাতের তুলনায় বারি সরিষা-২০-এর উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হবে বলে আশা করছেন গবেষকরা। সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাত মণ ফলন পাওয়া যাবে, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু ফলনই নয়, তেলের পরিমাণও বেশি হবে এই জাতে। ফলে কৃষক যেমন ভালো দাম পাবেন, তেমনি দেশের তেলজাতীয় ফসলের ঘাটতি পূরণেও এটি ভূমিকা রাখবে।
এই প্রদর্শনীর কৃষক আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘এখানে প্রায় ১০০ বিঘা জমির মধ্যে আমার সাড়ে তিন বিঘা জমি আছে। আগে এই জমিটা পতিত থাকত। এবার বারি সবিষা-২০ চাষ করেছি। ফসল তুলে সাথে সাথে বোরো ধান লাগাব। কম সময়ে ভালো ফলন হলে আমাদের জন্য বড় সুবিধা হবে।’ তার মতো আরো অনেক কৃষকই নতুন জাতের সরিষা দেখে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম নাসিম হোসেন। তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২০০ হেক্টর আবাদ বেড়েছে। আমন ধান কাটার পর বোরো ধান চাষের মাঝের যে স্বল্প সময় থাকে, সেই সময়েই সাধারণত সরিষা চাষ হয়। বারি সরিষা-২০ এই স্বল্প সময়ের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এটি প্রথমবারের মতো মাঠপর্যায়ে বড় আকারে চাষ হচ্ছে। বিরাজমান জাতগুলোর তুলনায় এটি অধিক উচ্চফলনশীল। বারি সরিষা-১৪-এর তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন হবে বারি সরিষা ২০-এ। তেলের পরিমাণও বেশি। রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রায় নেই বললেই চলে। জীবনকালও অন্যান্য জাতের তুলনায় কম হওয়ায় কৃষকরা এটি দ্রুত গ্রহণ করছেন।
একক উপজেলা হিসেবে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সরিষা উৎপাদন হয়। একই সাথে মধু উৎপাদনেও এটি দেশের শীর্ষে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুবর্ণা ইয়াসমিন জানান, ‘উল্লাপাড়া শুধু সরিষা উৎপাদনেই নয়, মধু উৎপাদনেও একক উপজেলা হিসেবে সেরা। এই মধু শত শত বেকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। চলনবিলের এই মধুকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’ তিনি জানান, সরিষার নতুন নতুন জাত সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ট্রাডিশনাল ও লোকাল জাতের পাশাপাশি বারি ১৪, ১৫, ১৭ এবং নতুন বারি সরিষা-২০ জাতের চাষ বাড়ছে। পার্টনার প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় তিনটি প্রদর্শনী দেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুরে মওলা বলেন, ‘বাংলাদেশে সিরাজগঞ্জ জেলার পরিচিতি একক ফসল হিসেবে সরিষা। আমরা চাই এই জেলার সরিষা চাষ আরো এগিয়ে যাক। সেই ধারাবাহিকতায় বারি উদ্ভাবিত নতুন জাত বারি সরিষা-২০ এক জায়গায় ১০০ বিঘা জমিতে চাষ করা হয়েছে।’ তিনি জানান, বর্তমানে বারি সরিষা-১৪, ১৫ ও ১৭ বেশি জনপ্রিয়, যেগুলোতে প্রতি বিঘায় গড়ে চার থেকে পাঁচ মণ ফলন হয়। তবে এসব জাতের চেয়েও বারি সরিষা-২০-এর ফলন বেশি, যা সাত থেকে আট মণ পর্যন্ত হতে পারে। জীবনকাল বারি-১৪ ও ১৭-এর কাছাকাছি হলেও বারি-২০ খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল, যা চরাঞ্চলের জন্য বড় সুবিধা।
মনজুরে মওলা আরো বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো রোপা আমন কাটার পর যে সময়টা জমি পতিত থাকে, সেই সময়ে সরিষা আবাদ করা। সরিষার পাশাপাশি মৌ চাষেও সিরাজগঞ্জ এগিয়ে রয়েছে। আমরা সেই চাষকে আরো সমৃদ্ধ করতে চাই এবং পরবর্তী সময়ে নির্বিঘেœ বোরো ধান আবাদ নিশ্চিত করতে চাই। যদি আমরা এক জমিতে তিনটি ফসল করতে পারি, তাহলে কৃষি আরো সমৃদ্ধ হবে।’
চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জ জেলায় সরিষা আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯০ হাজার হেক্টর, যা অর্জিত হয়েছে ৯০ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। গত বছর এই আবাদ ছিল ৮৭ হাজার হেক্টর। কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে এবার জেলায় এক লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরিষার সাথে চান্স ক্রপ হিসেবে মধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে চার লাখ চার হাজার কেজি। গত বছর ২৫৮ জন মৌচাষি এই এলাকায় মৌ বক্স স্থাপন করেছিলেন, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২২০ জন এসেছেন। ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ কেজি মধু উৎপাদন হয়েছে।
সরিষা ও মধু মিলিয়ে সিরাজগঞ্জে প্রায় এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ২৫০ কোটি টাকার বাজারমূল্য তৈরি হয় বলে জানান মনজুরে মওলা। তিনি বলেন, ‘আধুনিক জাত সম্প্রসারণ এবং মৌচাষিদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে এই সম্ভাবনা আরো বাড়বে। তবে মৌমাছি রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক ভাইদের অনুরোধ করছি, সরিষাক্ষেতে যদি বালাইনাশক প্রয়োগ করতেই হয়, তাহলে যেন অন্তত পড়ন্ত বিকেলে স্প্রে করেন। এতে মৌমাছি রক্ষা পাবে।’ তার মতে, সরিষা ও মধু চাষে সিরাজগঞ্জের যে একক আধিপত্য রয়েছে, বারি সরিষা-২০-এর মতো আধুনিক জাতের মাধ্যমে তা আরো সুদৃঢ় হবে।
পার্টনার (প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল এন্ড রূরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেসিলেন্স ইন বাংলাদেশ) প্রকল্পের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর (পিসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশে বছরে ২৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুই থেকে আড়াই লাখ টন তেল দেশীয় উৎপাদনে মেটানো সম্ভব হচ্ছে। কমপক্ষে ২০ লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি করতে হয়। আমদানি কমাতে হলে সরিষার আবাদ বাড়াতে হবে; কিন্তু সরিষার জন্য তো আলাদা জমি নেই। তাই উচ্চফলনশীলের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে।



