নিজস্ব প্রতিবেদক
বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড (ক্রসফায়ার) ও গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের দুই বহুল আলোচিত মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ২০ জন পলাতক আসামিকে আদালতে হাজির হতে জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
একই সাথে কক্সবাজারের টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে অপহরণ ও তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা এবং সাভারে শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিনকে সাঁজোয়া যান থেকে টেনে ফেলে নির্মমভাবে হত্যার পৃথক দুই মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ও ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আবদুল্লাহিল কাফীসহ ১০ আসামিকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদের একক বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের আলাদা আবেদনের শুনানি শেষে এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ দেন। একই সাথে উভয় মামলারই পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
একরাম হত্যা ও বদির বিচার
২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে কক্সবাজারের টেকনাফে র্যাবের সাথে তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নির্মমভাবে নিহত হন টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হক। দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিসহ চার আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে বিচারক তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারে পাঠানো অন্য তিন আসামি হলেন- সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহবুব আলম এবং র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক সাবেক কর্নেল মো: আনোয়ার লতিফ খান। এর মধ্যে মাহবুব আলম ও আনোয়ার লতিফ অন্য মামলায় আগে থেকেই ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে বন্দী, মিফতাহ উদ্দিন সেনাকাস্টডিতে এবং আবদুর রহমান বদি কারাগারে আটক রয়েছেন।
এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক সাত আসামির বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল না হওয়ার প্রতিবেদন (নন-এক্সিকিউশন রিপোর্ট বা এনইআর) আদালতে দাখিল করা হলে, তাদের আত্মসমর্পণের জন্য দু’টি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয়।
পলাতক বাকি ছয় আসামি হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক কোম্পানি কমান্ডার মেজর (অব:) রুহুল আমিন (রাজন), সাবেক কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো: আশেকুর রহমান এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিব মাহমুদ।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ড. মোহাম্মদ অলি মিয়া। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম ও মার্জিনা রায়হান। পরে ড. অলি মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘গেল ২৬ জুলাই এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। গ্রেফতার সাত আসামির ঠিকানায় সন্ধান না পাওয়ায় নিয়মানুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের শেষ সুযোগ হিসেবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির আদেশ দেয়া হয়েছে।’
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২৬ মে রাতে টেকনাফের হোটেল নেটংয়ের সামনে থেকে একরামুলকে তুলে নিয়ে মেরিন ড্রাইভের নোয়াখালীয়া পাড়ায় কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ, অবৈধ আটক, গুলি করে হত্যা এবং হত্যার নির্দেশ দেয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইয়ামিন হত্যা, সাঁজোয়া যান থেকে ফেলে মৃত্যুদৃশ্য
এ দিকে চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ১৮ জুলাই সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসহাবুল ইয়ামিনকে নির্মমভাবে গুলি করে ও সাঁজোয়া যানের ওপর থেকে ফেলে হত্যার মামলায় ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
কারাগারে যাওয়া আসামিরা হলেন- ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: আবদুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো: শাহিদুল ইসলাম, এএসআই মোহাম্মদ আলী, নায়েক সুহেল মিয়া, কনস্টেবল মাহফুজ মিয়া ও মিজানুর রহমান।
অন্য দিকে সাভারের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ পলাতক ১৩ আসামির হদিস না পাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধেও সমন জারি করে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
পলাতক অন্য আসামিরা হলেন- ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক এসপি আসাদুজ্জামান রিপন, সাভার থানার সাবেক ওসি শাহজামান, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ, সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল আলম রাজীব, মো: আতিকুর রহমান, ফখরুল আলম সমর, মেহেদী হাসান তুষার, রাজু আহম্মেদ, মো: ফরিদ, জামান খান এবং শরীফ আশরাফুল আলম বাবুল।
প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ট্রাইব্যুনালকে জানান, মোট ১৯ আসামির মধ্যে ছয়জন অন্য মামলায় বন্দী থাকায় আজ তাদের হাজির করা হয়। বাকিদের অনুপস্থিতির কারণে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বিচারের স্বার্থেই পত্রিকায় নোটিশ জারি করতে হচ্ছে।
প্রসিকিউশনের বর্ণনা মতে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আন্দোলনে হামলা চালিয়ে ইয়ামিনকে পুলিশের সাঁজোয়া যানের কাছে নিয়ে বুকের বাঁ পাশে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ আধমরা তরুণকে গাড়ির ওপর ফেলে রেখে চারপাশ ঘুরানো হয় এবং একপর্যায়ে সড়ক বিভাজকের ওপর নিচে ফেলে দেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আইনজ্ঞদের মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গণ-আন্দোলনে নির্বিচার গুলিবর্ষণের মতো অপরাধে শীর্ষপর্যায়ের নীতিনির্ধারক, সংসদ সদস্য এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের একই কাঠগড়ায় এনে বিচারের মুখোমুখি করার এই প্রক্রিয়া দেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন এক নজির হয়ে থাকবে।



