নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলা, জোর করে উচ্ছেদ
- ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে ২ ফিলিস্তিনি কিশোর নিহত
- গাজায় যুদ্ধের ক্ষত ‘আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ’
আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) সভাপতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আদালতের কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেললেও প্রতিষ্ঠান কোনো বাইরের চাপের কাছে নতি স্বীকার করবে না। বরং তারা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এ বছর ৯ জন আইসিসি কর্মকর্তা প্রসিকিউটর ও বিচারকসহ এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ তারা ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ তদন্ত শুরু করেছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, পুরো আদালতের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কথা ভাবছে ওয়াশিংটন। খবর রয়টার্সের।
আইসিসি সভাপতি বিচারক তোমোকো আকানে হেগে আদালতের বার্ষিক সভায় বলেন, “আমরা কখনো কোনো চাপ গ্রহণ করি না। আইন ব্যাখ্যা ও মামলার বিচার আমাদের নিজস্ব কাঠামো অনুযায়ী হবে।” তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞা কর্মকর্তাদের পরিবারকে অস্থির করেছে এবং ইউরোপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোতেও তাদের আর্থিক লেনদেন ব্যাহত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পদ জব্দ হয়েছে এবং তারা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে, যা প্রায় সব আন্তর্জাতিক ব্যাংকের সাথে যুক্ত। গত নভেম্বর আইসিসি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গালান্ট এবং নিহত হামাস নেতা ইব্রাহিম আল-মাসরিকে (মোহাম্মদ দেইফ নামে পরিচিত) গাজা সঙ্ঘাতে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
প্রসিকিউটর করিম খান মে মাসে হঠাৎ গাজা ও ইসরাইল সফর বাতিল করে একই দিনে নেতানিয়াহু ও গালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা চান। এ সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নেতারা ক্ষুব্ধ হন। আইসিসি জানায়, নেতানিয়াহু ও গালান্ট গাজায় ফিলিস্তিনিদের অনাহার ও নিপীড়নের জন্য দায়ী। ইসরাইল এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা যুদ্ধ চলাকালে মানবিক সহায়তা দিয়েছে। ইসরাইল দাবি করেছে, তারা বেসামরিক হতাহতের ঝুঁকি কমাতে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে হামাস বেসামরিক স্থাপনা ব্যবহার করে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি কর্মকর্তারা আইসিসির পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, আদালত ইসরাইলের নির্বাচিত নেতাদের সাথে হামাসের নেতাদের সমানভাবে তুলনা করছে। আগেও আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে তদন্তের কারণে আইসিসি কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচার করার ক্ষমতা রাখে। তবে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আদালতের প্রতিষ্ঠাতা রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি। তবে ২০১৫ সালে ‘প্যালেস্টাইন’কে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে আইসিসি এখতিয়ার দাবি করে, যদিও আন্তর্জাতিক আইনে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলা, জোর করে উচ্ছেদ : মঙ্গলবার ইসরাইলি সেনারা পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলীয় নাবলুস শহরে প্রবেশ করে এবং শহরের পশ্চিম অংশে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে। স্থানীয় সূত্র এ তথ্য আনাদোলুকে জানিয়েছে। প্রতক্ষ্যদর্শীরা আনাদোলুকে বলেন, ইসরাইলি সেনারা নাবলুসের জাওয়াতা রাউন্ডআবাউট ও আশপাশের এলাকা বন্ধ করে দেয় এবং নিরাপত্তার অজুহাতে বিস্ফোরক দিয়ে বাড়ি ভাঙার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কয়েকটি ফিলিস্তিনি পরিবারকে জোর করে উচ্ছেদ করে। এর আগের দিন সোমবার রাতে ইসরাইলি সেনারা দক্ষিণাঞ্চলীয় হেবরন শহরে প্রবেশ করে। কিরিয়াত আরবা বসতির কাছে গাড়ি চাপায় একজন ইসরাইলি সেনা আহত হওয়ার পর এ হামলা চালানো হয়।
স্থানীয়রা জানান, ইসরাইলি সেনারা বিভিন্ন দিক থেকে শহরে প্রবেশ করে এবং প্রবেশপথগুলো সামরিক চেকপয়েন্ট দিয়ে বন্ধ করে দেয়। সরকারি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনারা হেবরনের কয়েকটি হাসপাতালের আশপাশে অভিযান চালায় এবং প্রবেশপথে অবস্থান নেয়। ইসরাইলি সেনারা মঙ্গলবার জানিয়েছে, গাড়ি চাপার সাথে জড়িত ব্যক্তি হেবরনে নিহত হয়েছে। এ ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে যখন পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নজিরবিহীনভাবে বেড়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদের জীবন, সম্পদ ও জীবিকা এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
এ পর্যন্ত সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় এক হাজার ৮৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং দশ হাজার ৭০০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিশ হাজার ৫০০ জনকে বন্দী করা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক আদালত এক ঐতিহাসিক মতামতে জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখল অবৈধ। আদালত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমের সব বসতি উচ্ছেদের আহ্বান জানিয়েছিল।
পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ২ ফিলিস্তিনি কিশোর নিহত : পশ্চিম তীরে পৃথক ঘটনায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি কিশোর নিহত হয়েছে। প্রথম ঘটনা ঘটে হেবরনে। ইসরাইলি সেনারা দাবি করেছে, ১৭ বছরের মুহান্নাদ তারিক মোহাম্মদ আল-জুগাইর এক সেনাকে ছুরিকাঘাতের চেষ্টা করেছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়নি। কিশোরটি আহত হয়ে হেবরনের দিকে পালিয়ে যায়। পরে তাকে একটি গাড়ির ভেতরে পাওয়া যায় এবং হত্যা করা হয়।
তার লাশ ইসরাইলি সেনারা আটকে রেখেছে, যা এখন তাদের নিয়মিত প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামাল্লা হতে ১৮ বছরের রাসলেন আসমারকে সেনারা আটক করে। পরে তাকে মাটিতে ফেলে গুলি করা হয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা রক্তক্ষরণে ফেলে রাখা হয়। এদিকে পশ্চিম তীরজুড়ে ইসরাইলি সেনাদের হামলা চলছে। একই সাথে যাদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ রয়েছে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
খান ইউনুসে ইসরাইলি হামলায় ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক নিহত : ফিলিস্তিনি চিকিৎসা ও গণমাধ্যম সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ফটোসাংবাদিক মাহমুদ ওয়াদি নিহত হয়েছেন। তারা এটিকে যুদ্ধবিরতির নতুন লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছে। জেরুসালেম পোস্ট জানিয়েছে, ওয়াদি এলাকায় পরিস্থিতি নথিভুক্ত করার সময় ইসরাইলি ড্রোনের আঘাতে নিহত হন। তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। ইসরাইলি সেনারা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়ন এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, এটি গাজায় সংবাদকর্মীদের চলমান ঝুঁকিকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষাকারী সংগঠনগুলো বারবার সব পক্ষকে সাংবাদিকদের সুরক্ষা দিতে এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলতে আহ্বান জানিয়েছে।
গাজায় যুদ্ধের ক্ষত ‘আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ’ : গাজা উপত্যকার বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করা আন্তর্জাতিক চিকিৎসক ও নার্সরা জানিয়েছেন, প্রায় দুই বছরের ইসরাইলি হামলায় তারা যে ধরনের ক্ষত চিকিৎসা করেছেন তা আধুনিক কোনো সঙ্ঘাতে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ। এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট’। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
সোমবার প্রকাশিত রিপোর্টে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ৭৮ জন মানবিক স্বাস্থ্যকর্মীর সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। তারা গাজায় দায়িত্ব পালনকালে কী ধরনের ক্ষত কোথায় এবং কিভাবে হয়েছে তা নথিভুক্ত করেছেন। একটি ব্রিটিশ গবেষণা দল জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের আঘাত নিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় চিকিৎসা তথ্যসংগ্রহ। বিশেষ করে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রবেশাধিকার সীমিত থাকার কারণে এ তথ্য আরো গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার প্রধান লেখক ব্রিটিশ সার্জন ওমর আলতাজি এএফপিকে বলেন, অংশগ্রহণকারী দুই-তৃতীয়াংশ চিকিৎসক আগে অন্য সঙ্ঘাত এলাকায় কাজ করেছেন। তবু “অধিকাংশই বলেছেন, গাজায় তারা জীবনে দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষত চিকিৎসা করেছেন।” গবেষকদের মতে, চিকিৎসক ও নার্সরা দায়িত্ব শেষে বিস্তারিত প্রশ্নপত্র পূরণ করেছেন। আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দুই থেকে বারো সপ্তাহের দায়িত্ব শেষে তারা জানান, জটিল বিস্ফোরণজনিত ক্ষত, ভয়াবহ পোড়া, অঙ্গচ্ছেদ এবং ব্যাপক টিস্যু ক্ষতি ছিল সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় মানবিক সংস্থাগুলো আবারো সতর্ক করেছে গাজার ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে। অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ও অ্যানেসথেশিয়ার ঘাটতি এবং বিপুলসংখ্যক হতাহত সামলাতে চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন।
ইউএনআরডব্লিউএ-এর ছয় হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরাইল : জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, ইসরাইল প্রায় ছয় হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক আটকে রেখেছে। এসব ট্রাকে খাদ্য ও ত্রাণসামগ্রী রয়েছে, যা গাজার তিন মাসের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট। এ চালানে ১৩ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য লাখ লাখ তাঁবু ও কম্বলও রয়েছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
ইউএনআরডব্লিউএর গণমাধ্যম উপদেষ্টা আদনান আবু হাসনা সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধবিরতির পর গাজায় প্রবেশ করা ট্রাকের সংখ্যা আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে। তবে তা এখনো বিপুল চাহিদার তুলনায় অনেক কম। দুই বছরের যুদ্ধ ও অবরোধের পর গাজার মানুষের প্রয়োজন মেটাতে এ সংখ্যা যথেষ্ট নয়। তিনি জানান, ইসরাইল এখনো শত শত জরুরি পণ্য প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা সরঞ্জাম, পানি ও স্যানিটেশন সামগ্রী এবং মৌলিক খাদ্যপণ্য। আবু হাসনা আরো বলেন, “যা প্রবেশ করতে দেয়া হয়েছে তা মূলত কিছু বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাক। অথচ গাজার ৯৫ শতাংশ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এবং এসব পণ্য কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।” তিনি যোগ করেন, গাজার অধিকাংশ মানুষ প্রায় পুরোপুরি ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ত্রাণের ওপর নির্ভরশীলতা।



