নেতার প্রত্যাবর্তনে উদ্দীপ্ত বিএনপি

তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি এবং দেশ উভয়েরই লাভ হয়েছে। মানুষ মনে করছে, এই দলটাই সরকার গঠন করতে পারে। সুতরাং বিএনপি সরকার গঠন করলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য তিনি কী ভাবছেন, সেটা মানুষ বুঝতে পারবে।

মঈন উদ্দিন খান
Printed Edition

দেড় যুগের নির্বাসন কাটিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরায় বিএনপিতে একধরনের জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। নেতা-কর্মীরা উদ্বেলিত। তাদের মধ্যে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। বিএনপির নেতা-কর্মীরা বলেছেন, দলের এই উদ্দীপনা নির্বাচনের মাঠে টনিক হিসেবে কাজ করবে। গতি আসবে প্রচার-প্রচারণায়। সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলোও কেটে যাবে। মনোনয়ন নিয়ে ইতোমধ্যে যে বিভেদ তৈরি হয়েছে, তাও নেতার সরাসরি হস্তক্ষেপে সমাধান হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের অভিমত, তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি এবং দেশ উভয়েরই লাভ হয়েছে। মানুষ মনে করছে, এই দলটাই সরকার গঠন করতে পারে। সুতরাং বিএনপি সরকার গঠন করলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য তিনি কী ভাবছেন, সেটা মানুষ বুঝতে পারবে।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিকিৎসার জন্য সপরিবারে যুক্তরাজ্যের লন্ডন যান তারেক রহমান। লন্ডনে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক বছর তিনি চুপচাপ ছিলেন, রাজনৈতিক কোনো কার্যক্রমে অংশ নেননি। কিন্তু ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরে তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে আসেন। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করতে থাকেন তিনি। বিএনপির দাবি, লন্ডন থেকে তারেক রহমান দলকে সুসংগঠিত করার পাশাপাশি আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরেই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।

গত বৃহস্পতিবার তারেক রহমান লন্ডন থেকে দেশে ফিরেন। তার আগমন ঘিরে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। যেটার প্রতিফলন দেখা গেছে গত বৃহস্পতিবার যখন তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন। বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের তিনশ’ ফিটসহ তার চলাচলের রাস্তায় যে জনসমাগম-উপস্থিতি, অনেকের মতে সেটা ছিল স্মরণকালের সবচেয়ে বড় উপস্থিতি। গতকাল শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে গেলে সেখানেও এর ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। পুরো পথে নেতাকর্মীদের ছিল উপচেপড়া উপস্থিতি।

জানা গেছে, ধানের শীষের বিজয় ত্বরান্বিত করতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে নির্বাচনী গণসংযোগেও কাজে লাগাবে বিএনপি। যদিও এ ব্যাপারে দলের এখনো কোনো পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়নি। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নেতাকর্মীদের আরো উজ্জীবিত করার পাশাপাশি জনগণের কাছে পৌঁছাতে এবং বিএনপি তাদের জন্য কী কী করতে চায়, সেটা তুলে ধরতে তারেক রহমান ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে নির্বাচনী প্রচারণায় নামবেন। এর অংশ হিসেবে বিভাগীয় শহরগুলোতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে করে নির্বাচনী মাঠে এতদিন যে গ্যাপ ছিল, সেটা কেটে যাবে। একই সাথে মনোনয়ন নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, বিক্ষোভ-বিদ্রোহ হয়েছে, সমাধান হবে তাও। এর ফলে ধানের শীষকে বিজয়ী করতে সবাই একযোগে মাঠে নেমে পড়বে, যা বিএনপির বিজয় ত্বরান্বিত করতে সহায়ক হবে।

জানা গেছে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য আজ শনিবার ভোটার তালিকায় নাম লেখাবেন তারেক রহমান। এ দিন ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়া সংক্রান্ত সব কাজ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের কাজও সারবেন তিনি। অবশ্য তিনি কোন আসন থেকে বা কয়টি আসন থেকে নির্বাচন করবেন, দল থেকে সেটি এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। তবে ঢাকার একটি আসন থেকেও তিনি ভোট করতে পারেন বলে আলোচনা চলছে। সেক্ষেত্রে গুলশান, বনানী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসন থেকে তিনি নির্বাচন করতে পারেন। যদিও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের জন্য বিএনপি এই আসনটি ছেড়ে দিতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এখন খুব প্রয়োজনীয় ছিল। তার প্রত্যাবর্তনে দল এবং দেশ উভয়েরই লাভ হয়েছে। বিএনপি বর্তমানে স্ট্রাইকে রয়েছে। যেহেতু মানুষ মনে করছে-এই দলটাই সরকার গঠন করতে পারে। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ অবস্থায় তারেক রহমান দেশে ফেরায় এখন বিএনপির নেতৃত্বের মানুষের কাছাকাছি যাওয়া, জনগণের কথা শোনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে করে বিএনপির প্রধান নেতা কে, ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, দেশের জন্য তিনি কী ভাবছেন- সেটা মানুষ বুঝতে পারল অর্থাৎ এখন এই দলটার আর কোনো সীমাবদ্ধতা রইলো না। অন্য দিকে তিনি নিজেও নাগরিকদের বুঝতে পারছেন। এটা দূর থেকে বলা-বোঝা আর সামনে এসে বলা-বোঝার মধ্যে পার্থক্য আছে। এককথায় মানুষের সাথে তার সরাসরি একটা যোগাযোগ তৈরি হলো, এটা খুব দরকার ছিল। এটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের সাথে বিএনপির একটা অটুট বন্ধন তৈরি করবে। এটা সার্বিক বিবেচনায় দেশের জন্যও ভালো।

তিনি আরো বলেন, এতদিন লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দল পরিচালনা করে আসা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশে ফেরায় দলের ওপর তার অত্যন্ত ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ থাকবে।

উদ্দীপ্ত নেতা-কর্মীরা

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব আব্দুস সালাম আজাদ বলেন, বিএনপির ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি তারেক রহমান দেশের মাটিতে ফিরে আসায় শুধু নেতা-কর্মীরাই উদ্দীপ্ত নয়, পুরো জাতিই আজ আশান্বিত।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুর রহমান সুমন বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে নেতার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। এখন নেতা আমাদের মাঝে। তিনি নিজেই সরাসরি এখন সব দেখভাল করবেন, দলের নেতৃত্ব দেবেন। এটি আমাদের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি।

যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যমণি দেশে ফিরে আসায় বিএনপিতে আরো বেশি প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। দেশে যে রাজনৈতিক শূন্যতা ছিল তা কেটে গেছে। আগামীতে তার হাত ধরেই দেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হবে।

যুবদল নেতা মাসুদ রানা বলেন, আমাদের প্রাণ তারেক রহমান। তিনি দেশে ফিরে আসায় আমরা আবেগাপ্লুত। তার জন্য আমরা জীবন দিতেও রাজি আছি।