রাজধানীতে বৃষ্টির দুর্ভোগ চার কারণে

আবুল কালাম
Printed Edition

  • খাল গ্রাস
  • জলাভূমি ভরাট ও সমন্বয়হীনতা

অল্প বৃষ্টিতেই ডুবছে রাজধানী ঢাকা। এতে করে বর্ষা মওসুমে কয়েক মিলিমিটার বৃষ্টিতেই প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি তলিয়ে যাচ্ছে। ফলে নাগরিক ভোগান্তির সাথে ঢাকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থবির হয়ে পড়ছে। সেই সাথে দেখা দিয়েছে নিরাপত্তার হুমকি।

সংশ্লিষ্টরা এর জন্য চার কারণকে দায়ি করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে- প্রাকৃতিক জলাশয় ও খাল বিলুপ্তি, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যত্রতত্র পলিথিন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সরু ড্রেনেজ ব্যবস্থা।

বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে আড়াই দুই কোটিরও বেশি ওয়ান-টাইম (একবার ব্যবহারযোগ্য) পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে। ওজনের হিসেবে রাজধানীতে প্রতিদিন উৎপাদিত প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যরে পরিমাণ প্রায় ৬৪৬ টন, যা পুরো দেশের মোট প্লাস্টিক বর্জ্যরে প্রায় ১০ শতাংশ।

পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার গবেষণা অনুসারে, ঢাকায় প্রতিদিন একটি পরিবার গড়ে অন্তত ৫টি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। আর বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় দৈনিক প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য তৈরি হয়। যা ২০০৫ সালে ছিল মাত্র ১৭৮ টন। অন্য দিকে রাজধানীর বাসিন্দারা বছরে গড়ে ২২.২৫ কেজি প্লাস্টিক ও পলিথিন ব্যবহার করেন, যা দেশের অন্যান্য শহরাঞ্চলের তুলনায় তিনগুণ বেশি।

এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্যরে মাত্র ৩৭.২ শতাংশ রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি প্রায় ৬৩ শতাংশেরও বেশি বর্জ্য সরাসরি হাতিরঝিল, বুড়িগঙ্গা নদী, শহরের বিভিন্ন নালা-নর্দমা, সুয়ারেজ লাইন এবং উন্মুক্ত ল্যান্ডফিলে গিয়ে জমা হয়। পলিথিনের এই অনিয়ন্ত্রিত নিষ্কাশনই ঢাকার ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ আটকে দিচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই তীব্র জলজট সৃষ্টি করছে।

বিগত দেড় থেকে দুই দশকে (২০০৫ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে) বাংলাদেশে পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রায় ৩ গুণ বা ২০০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক এবং পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করার পর শুরুর দিকে এর ব্যবহার কিছুটা কমলেও, পরবর্তী একযুগে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো কমার্স ও প্যাকেজিং কালচার, মিনি প্যাক বা স্যাশের দাপট ও আইন প্রয়োগে শিথিলতা।

ঢাকা শহরের বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের তাত্ত্বিক পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ মিলিমিটার। তবে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীদের তথ্য মতে, পলিথিন ও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় বর্তমানে বাস্তব ড্রেনেজ সক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটারে নেমে এসেছে। ফলে ঢাকায় যখনই ভারী বৃষ্টি হয়, তখনই ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কয়েক কোটি লিটার পানি রাস্তায় জমে দীর্ঘস্থায়ী জলজট তৈরি করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি ঢাকায় মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার থেকে ১৩০ মিলিমিটার পর্যন্ত অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে বলা হয়, যদি ৬ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়, তবে ঢাকার ড্রেনগুলো সর্বোচ্চ ৬০ মিলিমিটার (প্রতি ঘণ্টায় ১০ মিলিমিটার হারে) পানি সরাতে পারে। বাকি ৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি সম্পূর্ণ অতিরিক্ত পানি হিসেবে রাস্তায় জমে থাকে।

বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশবিদদের গবেষণা অনুযায়ী, শহরের নিচু এলাকা এবং প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় ঢাকা তার ১২৫ থেকে ৩২৫ মিলিয়ন (১২.৫ থেকে ৩২.৫ কোটি) কিউবিক মিটার স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে। এই অতিরিক্ত কোটি কোটি লিটার পানি সরাতে যে পরিমাণ শক্তিশালী পাম্প স্টেশন দরকার, বর্তমানে ঢাকার মাত্র ৩টি প্রধান পাম্প স্টেশন (কল্যাণপুর, ধোলাইখাল ও রামপুরা) দিয়ে তা মেটানো সম্ভব হয় না। অর্থাৎ ড্রেনের ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পানি বর্তমানে অতিবৃষ্টির সময়ে ঢাকার রাস্তায় জমা হচ্ছে এবং ড্রেন ময়লায় আটকে থাকায় সেই পানি সরতে ৪ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্য এবং নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে রাজধানীর প্রধান সড়ক ও অলিগলিগুলো তলিয়ে যাওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নাগরিক সমস্যা দায়ী। এ বিষয়ে দক্ষিণের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলছেন, ঢাকায় জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ পলিথিন, এর ব্যবহার কমানো না গেলে জলাবদ্ধতা ঠেকানো সম্ভব না। গতকাল নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, জলজট হওয়া সব এলাকায় পানি চলাচলের রাস্তায় পলিথিন জমে ছিল। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বিপুল পরিমাণ পলিথিন সংগ্রহ করেছেন। তার ভাষ্য, ঢাকার জলাবদ্ধতা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। ঢাকার খালগুলোকে পুনরায় আগের অবস্থায় ফেরানো গেলে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। সেই সাথে ঢাকার পানি বুড়িগঙ্গা বা শীতলক্ষ্যায় নেয়া গেলে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।