সংসদ নির্বাচন ছিল নির্ভরযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক

ব্রিফিংয়ে ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশন প্রধান

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ইভার্স ইজাবস বলেছেন, ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন ছিল নির্ভরযোগ্য ও সুপরিচালিত; যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই ঐতিহাসিক লড়াইটি ছিল প্রকৃত অর্থেই প্রতিযোগিতামূলক, যেখানে মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান করা হয়েছে। নির্বাচনের আইনি কাঠামো অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক মানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে। এটি অংশীজনদের আস্থা ধরে রেখেছে এবং নির্বাচনের সততা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে।

নির্বাচন ও কয়েকটি সংসদীয় আসনের ফলাফলে অনিয়মের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু এগুলো কারসাজির বৃহত্তর দাবিগুলোকে সমর্থন করে না। জালিয়াতি বা ব্যালট বক্সভর্তির প্রত্যক্ষ কোনো পর্যবেক্ষণ আমাদের ছিল না। যদি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকাসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকে, তাহলে প্রতিষ্ঠিত আইনি পদ্ধতির মাধ্যমেই তা সমাধান করা উচিত। অভিযোগ ও আপিল অবশ্যই স্বচ্ছতা ও দক্ষতার সাথে নিষ্পত্তি করতে হবে।

গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে ইভার্স ইজাবস এসব কথা বলেন। ইইউ পর্যবেক্ষক মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন তুলে ধরার জন্য এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়, যাতে দেশী-বিদেশী সাংবাদিক, কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন গত ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। মিশনটি নির্বাচনের দিনে সব মিলিয়ে ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়ে কাজ করেছে। এ পর্যবেক্ষকেরা ইইউর সব সদস্য রাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে এসেছেন। স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনের দিন দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় সক্রিয় ছিলেন। মিশনের কিছু সদস্য মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করে পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করবেন। নির্বাচনের দুই মাস পর সুপারিশসহ মিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

নির্বাচন সুশৃঙ্খল, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ ছিল উল্লেখ করে ইভার্স ইজাবস বলেন, নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে ভোটকেন্দ্র খোলা, ভোটগ্রহণ ও ভোটগণনা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের উপস্থিতি নির্বাচনের স্বচ্ছতা জোরদার করেছে। একই সাথে রিটার্নিং অফিসারদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ফলাফলসংক্রান্ত নিয়মিত তথ্য প্রদান এবং গণমাধ্যমে প্রচার জনআস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হয়েছে। প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসর, বিশেষ করে মাত্র ৪ শতাংশ নারী প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচনে তাদের সমান অংশগ্রহণকে ব্যাহত করেছে। ভোটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হয়নি। এ ছাড়া কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে সৃষ্ট বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণের (মব অ্যাটাক) আশঙ্কা ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে। ইতিবাচক উদ্যোগ না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুরা এখনো রাজনৈতিক পরিসরে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন কতটা অংশগ্রহণমূলক হলো- জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এখানে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে এসেছি। আমাদের আগ্রহের বিষয় হলো নির্বাচনের প্রক্রিয়া। তবে ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা রূপান্তরমূলক বিচারব্যবস্থা অনেক দেশের জন্য একটি বেদনাদায়ক ও সংবেদনশীল বিষয়। এর মধ্যে অনেক ইউরোপীয় দেশও রয়েছে। তবে অবশ্যই নির্বাচন হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ।

ভোটার উপস্থিতিসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ইজাবস বলেন, ভোটার উপস্থিতির বিষয়ে আমরা সবাই জানি যে বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে এটি কখনো বেশি, আবার কখনো কম হয়েছে। সেই অর্থে আমরা দেখছি এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি মাঝারি অবস্থানে রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ভোটার উপস্থিতিকে কেবল শতাংশের দিক থেকে বিবেচনা করছি না; কারণ ইউরোপসহ অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই ভোটার উপস্থিতি কমে যাচ্ছে। এটি সব গণতন্ত্রের জন্যই একটি বড় উদ্বেগের বিষষ। তাই সংখ্যাই সব নয়।

ইভার্স ইজাবস বলেন, এখন সময় এসেছে নির্বাচনের পুরনো চর্চাগুলো পরিত্যাগ করার, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান উত্তরণের সাথে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সেই সাথে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও জবাবদিহিতা জোরদারের অভিপ্রায়ে একটি নতুন পথরেখা নির্ধারণ করার এটিই উত্তম সময়। তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার ক্ষেত্রে নাগরিক পর্যবেক্ষক, ফ্যাক্ট-চেকার, তরুণ ও নারী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যদের প্রতিনিধিদলের নেতা টমাস জদেখোভস্তি মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পদার্পণ করেছে। আমরা নতুন সংসদ ও সরকারকে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিয়ে গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই।

গণভোটের ফলাফল সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে : কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের প্রধান ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট আকুফো-আদ্দো বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গণভোটের পক্ষে ৬২ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে। গণভোটের এই ফলাফল নির্বাচিত সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সংস্কার বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। গতকাল একই হোটেলে আয়োজিত পৃথক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। আকুফো-আদ্দো ১৪ সদস্যের পর্যবেক্ষক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যারা কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন।

নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেছে উল্লেখ করে আকুফো-আদ্দো বলেন, ভোটার উপস্থিতি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক ছিল। আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ভোটার ও পর্যবেক্ষকদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। মূল ধারার গণমাধ্যম রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যাপকভিত্তিক কভারেজ দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। নির্বাচনী প্রচারণা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল। প্রার্থীরা মোটা দাগে নির্বাচনী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।