আলজাজিরা ও রয়টার্স
ইরানের অর্থনৈতিক ভিত ধসিয়ে দিতে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা চালুর হুঁশিয়ারি দেন। এর ঠিক এক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ শুরুর কথা জানিয়েছিলেন, যেখানে তেহরানকে সহায়তাকারী যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেও ‘ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি’র হুমকি দেয়া হয়।
তবে মূল বাজার ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই চরম পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কৌশল এবং চীন-রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে স্পষ্টতা নেই। এপ্রিলে ও জুনে দু’বার চুক্তি হলেও টেকেনি কোনো যুদ্ধবিরতি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় গত এপ্রিলে শুরু হওয়া মার্কিন নৌ অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রীর মতে, সোমবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে যে বিস্তারিত রূপরেখা দেয়া হবে, তা ইরান সরকারকে পতনের মুখে ঠেলে দেবে।
ওয়াশিংটনের এই অবস্থানকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেন, ট্রাম্পের এ ধরনের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সঙ্কট ও নিজস্ব ব্যর্থতা থেকে বিশ্ববাসীর নজর সরানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।
চীন-রাশিয়া প্রতিরোধ ও ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ
অর্থনৈতিকভাবে তেহরানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা কার্যকর করা বেশ জটিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেপলারের ২০২৫ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, সমুদ্রপথে ইরানের রফতানি করা তেলের ৮০ শতাংশেরই গন্তব্য চীন। ফলে বেইজিংকে লক্ষ্য করে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতির জন্যই বিশাল ঝুঁকিপূর্ণ হবে। কারণ তারা গুরুত্বপূর্ণ খনিজসহ বহু পণ্যের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল। বেইজিং ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে, চাপ বা নিষেধাজ্ঞা কোনো সমাধানের পথ নয়। আবার আগামী মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের নির্ধারিত সময় থাকায় বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত চড়াও হওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন।
অন্য দিকে রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক যোগসাজশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দু’দেশের মধ্যে ২০ বছর মেয়াদি অংশীদারত্ব চুক্তি সই হওয়ার পর চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দাঁড়িয়েছে ৪৮০ কোটি ডলারে। এমনকি ইউরোপীয় একটি নথির তথ্য অনুসারে, রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ সরবরাহ করা হচ্ছে ইরানে। পাশাপাশি ব্রিকস জোটে নিজেদের অবস্থান কাজে লাগিয়ে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)-এর মাধ্যমে বিকল্প মুদ্রায় লেনদেনের চেষ্টা চালাচ্ছে তেহরান। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন একতরফাভাবে এমন কিছু চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে যার জন্য জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বহুপক্ষীয় সম্মতি প্রয়োজন। নিজ দেশেও ট্রাম্প ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন; যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম মার্কিনিদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির জনসমর্থনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সবমিলিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্প্রতি ইরানের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও চীন ও রাশিয়ার শক্তিশালী সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে ট্রাম্পের এই চরম নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।



