রক্তরঞ্জিত জুলাই-২১

কারফিউর দ্বিতীয় দিনেও থেমে ছিল না সংঘর্ষ

ঢাকায় ১০ জনসহ সারা দেশে নিহত ১৯

বিস্ফোরণ ঘটানো হয় একের পর সাউন্ড গ্রেনেড। তীব্র শব্দে প্রকোম্পিত হয়ে ওঠে রাজধানীর ঢকার অলিগলি। শুধু স্থলপথেই নয়, আকাশ পথে হেলিকাপ্টারেও গুলি চালানো হয়।

আমিনুল ইসলাম
Printed Edition

সরকার ঘোষিত কারফিউর দ্বিতীয় দিনেও কমপ্লিট শাটডাউনে উত্তাল ছিল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। ২০২৪-এর ২১ জুলাই রোববারও রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকাসহ সারা দেশে আন্দোলনকারীদের সাথে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার সদস্যের (পাঁচ বাহিনী) ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণায় থেকে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয়া হয়। সংঘর্ষে ঢাকাসহ সারা দেশে ১৯ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় ১০ জনের মৃত্যু হয়। নরসিংদীতে ৪, গাজীপুরে ২, নারায়ণগঞ্জে ১, সাভারে ১ ও চট্টগ্রামে ১ জনের মৃত্যু হয়। যেখানে আন্দোলনকারীরা নেমেছিল সেখানেই চালানো হয় গুলি, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট। বিস্ফোরণ ঘটানো হয় একের পর সাউন্ড গ্রেনেড। তীব্র শব্দে প্রকোম্পিত হয়ে ওঠে রাজধানীর ঢকার অলিগলি। শুধু স্থলপথেই নয়, আকাশ পথে হেলিকাপ্টারেও গুলি চালানো হয়। এদিন ইন্টারনেটের পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয় ডিশ লাইনও। যাতে সেদিনের সেই ভয়াবহ দৃশ্য মানুষ দেখতে না পারেন।

এ দিন সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সরকারি চাকরিতে ৭ শতাংশ কোটা ব্যবস্থা রেখে বাকি ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং সরকারের নির্বাহী বিভাগকে অনতিবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করতে নির্দেশ দেয়া হয়। সেদিনের সংঘর্ষে দুই পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে তিনজনই গার্মেন্ট শ্রমিক। এ ছাড়া ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত হন চারজন। সংঘর্ষে বিভিন্ন এলাকায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০ জন। যার মধ্যে ৬০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হযেছে। এদের মধ্যে ৩৮ জনই গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎিসাধীন ছিলেন।

শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও সরকারের কারফিউ অচল হয়ে পড়ে গোটা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। রাজধানীর মালিবাগ, রামপুরা, বাড্ডা, বারিধারা, প্রগতি সরণি। অপর দিকে কাজপুর থেকে শুরু করে চিটাগাং রোড, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ। মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, মিরপুর-১০, বেনারসীপল্লী, মিরপুর-১৩, সেনপাড়া পর্বতা, রামপুরা, বাড্ডা, ডেমরা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশ সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। রোববার সকাল থেকেই থেমে চলতে থাকে এই সংঘর্ষ।

ঢাকায় নিহত ১০ আহত দুই শতাধিক : সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে সেনাবাহিনী পুলিশ বিজিবি, আসনার র‌্যাব সদস্যদের সংঘর্ষে কমপপক্ষে ১০ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছে দুই শতাধিক। যাদের মধ্যে ৬০ জনকে ভর্তি করা হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। এদের মধ্যে ৩৮ জন ছিল গুলিবিদ্ধ। এ ছাড়া বাকিরা রাজধানীর বিভিন্ন হসপিটালে ভর্তি রয়েছেন।

এ দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাথে সংঘর্ষে কয়েক শ’ আন্দোলনকারী আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন ছিল। এদিন সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৯ গাড়িতে আগুন দেয়া হয়। ২১ জুলাই চতুর্থ দিনের মতো সারা বাংলাদেশ ইন্টারনেটবিহীন এবং কারফিউ বলবৎ ছিল। এ দিন ভোরে ঢাকার পূর্বাচল এলাকায় আন্দোলের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে পাওয়া যায় এবং পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে শুক্রবার (১৯ জুলাই) রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে নাহিদ ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৬ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষের করা লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে এদিন সকাল ১০টার দিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। সব পক্ষের শুনানি শেষে বেলা ১টার দিকে রায় ঘোষণা করা হয়। এতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় সামগ্রিকভাবে বাতিল (রদ ও রহিত) করা হয়। রায়ে বলা হয়, কোটাপ্রথা হিসেবে মেধাভিত্তিক ৯৩ শতাংশ; মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ; ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো। তবে নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদগুলো সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। এই নির্দেশনার আলোকে সরকারের নির্বাহী বিভাগকে অনতিবিলম্বে প্রজ্ঞাপন জারি করতে নির্দেশ দেন আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিতে এ রায় দেন। রায়ে বলা হয়, এই নির্দেশনা ও আদেশ সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজনে ও সার্বিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে। কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগের দেয়া রায়কে স্বাগত জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। রায়ের পর এ প্রতিক্রিয়ায় আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম জানান, আপিল বিভাগের রায়কে শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত হিসেবে দেখছেন তারা।

এ দিকে এ রায়ের পর শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তবে চার দফা দাবি পূরণে বৈষম্যবারোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। চার দফা দাবির মধ্যে ছিল- কারফিউ তুলে দেয়া, ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করা, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল খুলে দেয়া এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচারসহ আট দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান এবং ২২ জুলাই (সোমবার) গায়েবানা জানাজা কর্মসূচির ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।

সরকারের ঘোষাণা অনুযায়ী, ২১ জুলাই সারা দেশে সাধারণ ছুটি ছিল। এ অবস্থায় সারা দেশের পোশাক কারখানাসহ অন্য বড় শিল্প-কারখানাও বন্ধ রাখা হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ২২ জুলাই (সোমবার) কারফিউ বলবৎ থাকবে। বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল থাকবে। ঢাকা জেলা ও মহানগর, গাজীপুর জেলা ও মহানগর এবং নারায়ণগঞ্জে কারফিউয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জেলা প্রশাসকরা পরিস্থিতি বিবেচনা করে কারফিউয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

চলমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আন্দোলনকালীদের দেখা মাত্র গুলি করার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই পরিস্থিতেও এদিন রাজধানীর বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কুড়িল ও মিরপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সাথে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনের সংঘর্ষ, গুলি, হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়। এসব মামলায় গত পাঁচ দিনে ঢাকায় প্রায় ২০০ জনসহ সারা দেশে অন্তত ৫৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন বেশির ভাগ ছিলেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা।

রাজধানীর সেতু ভবন ভাঙচুর, রামপুরার বিটিভি ভবনে আগুন দেয়া ও বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন মামলায় বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিপুণ রায় ও গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নুরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি পক্ষ ৯ দফা দাবি জানিয়ে শাটডাউন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। ২১ জুলাই সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গণমাধ্যমকে নিহতের তথ্য দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়। ২০ জুলাই রাত ৮টার দিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মো: জাহাঙ্গীর আলমের বাসভবনে হামলা চালান আন্দোলনকারীরা। রোববার সকালে দ্বিতীয় দফায় জাহাঙ্গীরের বাসভবনে হামলা চালানো হয়। তারা ইটপাটকেল ছুড়ে ভবনের বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করেন।

এদিন এক বিজ্ঞপ্তিতে পিএসসির পক্ষ থেকে বলা হয়, আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত পিএসসির সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। ২১ জুলাই রাতে দেশের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে সামরিক-বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সশস্ত্রবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার উপস্থিত ছিলেন।