সংসদের এ অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে : মিয়া গোলাম পরওয়ার

Printed Edition
কক্সবাজার শহর জামায়াতে ইসলামীর ঈদ পুনর্মিলনীতে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার  : নয়া দিগন্ত
কক্সবাজার শহর জামায়াতে ইসলামীর ঈদ পুনর্মিলনীতে বক্তব্য রাখেন মিয়া গোলাম পরওয়ার : নয়া দিগন্ত

ঈদগাঁও ( কক্সবাজার ) সংবাদদাতা

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয় নিয়োগের মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছে। তিনি বলেন, বিএনপি জনরায়কে ভয় পায় আওয়ামী লীগের মতো। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন না দিয়ে দলীয় লোকজনকে চেয়ারে বসাচ্ছে। এর পরিণতি শুভ হবে না। গেল জাতীয় নির্বাচনে এক্সট্রা অর্ডিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। আমরা আল্লাহর দরবারে মামলা করে দিয়েছি। ফয়সালা আল্লাহই করবেন। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরি অডিটরিয়ামে শহর জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ঈদ পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, পাঁচ বছর ভেজাল ধরার ইলম অর্জন করতে হবে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ লড়াইয়ে আমাদের জিততে হবে।

বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে শিক্ষা নিন। রাজনীতিতে আর নতুন সঙ্কট যেন তৈরি না হয়। জনগণের অভিপ্রায় বাস্তবায়ন করুন। বিরোধী দল হিসেবে আপনাদের পাশে থাকবো। জাতীয় সংসদের চলমান অধিবেশনেই সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। চার কোটি মানুষের রায়কে অবজ্ঞা করার ষড়যন্ত্র রুখতে দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।

বিএনপির কপাল খারাপ মন্তব্য করে মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, আমাদের কপাল খারাপ না। জনগণের কপালও খারাপ না। যারা কথা দিয়ে কথা রাখে না তাদের কপাল খারাপ। তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায় হচ্ছে সবচেয়ে বড় আইন। মানুষের জন্য আইন, আদালত ও সংবিধান। অবিলম্বে জন অভিপ্রায় অনুসারে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।

শহর জামায়াতের আমির আব্দুল্লাহ আল ফারুকের সভাপতিত্বে ঈদ পুনর্মিলনীতে গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কেমন ভোট হয়েছে জনগণের কাছে তা স্পষ্ট। জনরায়কে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।

এরপরও দেশের শান্তিশৃঙ্খলার স্বার্থে কষ্ট চাপা দিয়ে ফলাফল মেনে নিয়েছে জামায়াত। তার মানে অন্যায়, অসত্য, অনিয়মকে আমরা মেনে নিবো না।

নির্বাচনের আগে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বিএনপি, এমন মন্তব্য করেছেন প্রধান অতিথি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, জুলাই সনদকে কোনো আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না মর্মে বিএনপি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু তারা বর্তমানে ১৮০ ডিগ্রি ব্যাক করেছে। জুলাই সনদ কী, বাড়ির কাজের মেয়েরাও বুঝে। শুধু বিএনপি বুঝে না!

শহর জামায়াতের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি দরবেশ আলী মুহাম্মদ আরমানের সঞ্চালনায় ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন শহর জামায়াতের আমির আব্দুল্লাহ আল ফারুক।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী বলেছেন, সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও বিএনপি দলীয় লোকদের স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহে প্রশাসক নিয়োগ দিচ্ছে, যা অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক। যদি আর কোনো স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয় তাহলে জনগণকে সাথে নিয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি মাহে রমাদানের শিক্ষার আলোকে ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সততা ও যোগ্যতার সাথে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে মাঠে-ময়দানে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মুফতি মাওলানা হাবিবুল্লাহ, সেক্রেটারি জাহেদুল ইসলাম, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের জেলা সভাপতি শামসুল আলম বাহাদুর, জেলা সাংগঠনিক সেক্রেটারি আল আমীন মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, কক্সবাজার-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী শহিদুল আলম বাহাদুর, জেলা শিবিরের সভাপতি মীর মোহাম্মদ আবু তালহা, জেলা বারের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার উদ্দিন হেলালী প্রমুখ ।

এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক নয়া দিগন্তের কক্সবাজার অফিস প্রধান অ্যাডভোকেট জিএএম আশেক উল্লাহ, শহর জামায়াতের নায়েবে আমির কফিল উদ্দিন চৌধুরী, শহর যুব বিভাগের পরিচালক জাহেদুল ইসলাম নোমান, ঝিলংজা ইউনিয়ন আমির শহীদুল্লাহ।

উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা খাইরুল বাশার, সাবেক জেলা সেক্রেটারি ও কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শাহজালাল চৌধুরী, জেলা সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তাহের চৌধুরী, জেলা অফিস সেক্রেটারি মুহাম্মদ শাহজাহান, সদর উপজেলা আমির অধ্যাপক খুরশিদ আলম আনসারী, সাবেক সদর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সেলিম উল্লাহ বাহাদুর, রামু উপজেলা সেক্রেটারি আ ন ম হারুন ও মাওলানা আব্দুর রশীদ প্রমুখ।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার ও বিএনপি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে

কক্সবাজার অফিস জানান, জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে বর্তমান সরকার ও বিএনপি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পারওয়ার। এটিকে রাজনৈতিক ‘দ্বিচারিতা’ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। এ সময় জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন হওয়া উচিত বলেও জানান জামায়াতের এ নেতা।

গত সোমবার দুপুরে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

মিয়া গোলাম পারওয়ার বলেন, ‘সহস্রাধিক প্রাণ আর হাজারো মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সরকার গঠন করার পর সেই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিএনপি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে অঙ্গীকার করেছিল, এখন তারা সেখান থেকে সরে এসে ভিন্ন পথে হাঁটছে।’ তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘জুলাই সনদকে চ্যালেঞ্জ না করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরোক্ষভাবে একটি পক্ষকে দিয়ে আদালতে রিট করিয়ে বিষয়টিকে ‘সাব-জুডিস’ বা বিচারাধীন করা হয়েছে।’

জামায়াতের এ নেতা বলেন, ‘সরকারের পরোক্ষ মদদে এটি করা হয়েছে যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এক দিকে জনগণের কথা বলা, অন্য দিকে নেপথ্যে ভিন্ন কৌশল নেয়া- একে দ্বিচারিতাই বলা হয়।’

বক্তব্যে তিনি গণভোট প্রসঙ্গ তুলে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে গণভোটের পক্ষে জনসমর্থন ছিল বেশি। আইন মানুষের জন্য, মানুষ আইনের জন্য নয়। তাই পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে জুলাই সনদকে অস্বীকার করা গণতন্ত্রকামী দলের কাজ হতে পারে না।’

জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সরকারকে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিন এবং জুলাই জাতীয় সনদকে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারের মাধ্যমে সংবিধানের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করুন। এটাই এখন সঙ্কট নিরসনের একমাত্র পথ।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি সমাধান পার্লামেন্টে করবেন না কি জনগণকে আবারও রাজপথের আন্দোলনে ঠেলে দেবেন।’ জামায়াতে ইসলামী একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে সংসদে ও রাজপথে জনগণের পক্ষে ভূমিকা পালন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

এ সময় বিমানবন্দরে জেলা জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান।