ক্রীড়া প্রতিবেদক
‘ভাই এ দিকে আসেন। দেখেন ড্রেসিং রুমের অবস্থা। এটা কি কোনো ফুটবল লিগের ড্রেসিং রুম হতে পারে।’ ক্ষোভের সাথেই কথাগুলো বললেন গৌরীপুর স্পোর্টিং ক্লাবের এক কর্মকর্তা। একটু এগোতেই দেখা খিলগাঁও ফুটবল অ্যাকাডেমির আরেক ফুটবল কর্মকর্তার সাথে। তার ঝাঁঝালো কণ্ঠ, ‘এই ড্রেসিং রুমে কিভাবে ফুটবলাররা বসে বিশ্রাম নেবেন। বিদ্যুৎ নেই। ফলে আলো যেমন নেই তেমনি এয়ারকন্ডিশনও নষ্ট। এতে ফুটবলাররা ঘামতে ঘামতেই শেষ। ম্যাচে আর খেলবে কি।’ চলমান প্যারাগন ডেইরি দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লিগের ভেনু কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোস্তফা কামাল স্টেডিয়াম। ড্রেসিং রুমে গিয়ে দেখা গেল ড্রেসিং রুমের একটি মাত্র জানালা। সেখানে পর্দা সরিয়ে রাখা হয়েছে আলো বাতাস প্রবেশের জন্য। তাতেও পর্যাপ্ত আলো আসে না। ফলে মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। ফ্লোরে পানি। খেলোয়াড়রা বেশিক্ষণ বসতে পারছিলেন না গরমের জন্য। গৌরীপুর স্পোর্টিং ক্লাবের কোচ হারুনুর রশীদ জানান, গত দুই সপ্তাহ যাবৎ বিদ্যুৎ নেই এই ড্রেসিং রুমে। ফলে এতে তো অন্ধকার। তার ওপর প্রচণ্ড গরম। খেলোয়াড়রা বিরতির সময় সেখানে গিয়ে যে বিশ্রাম নেবে সেই উপায়ই নেই।
১৪ দল নিয়ে ৩ জুলাই থেকে কমলাপুর স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে এই লিগ। ১৫ দল নিয়ে লিগ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে সরে যায় বিক্রমপুর কিংস। ফলে ১৪ দলের এই লিগ। এতে এবারের লিগ থেকে নেমে যাবে একটি দল। আর সিনিয়র ডিভিশনে প্রমোশন পাবে দুই দল।
তবে দেশের ফুটবলের অন্যতম এই আন্তর্জাতিক ভেনুর করুন দশা অস্বস্তি¡কর পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে ফুটবলারদের। ড্রেসিং রুমের যেমন বাজে অবস্থা তেমনি ভিআইপি গ্যালারিরও। বিদুৎ না থাকায় ভিআইপি গ্যালারিতে বসা যায় না। টয়লেটের অবস্থা আরো জঘন্য। আর তিন তলা ও চার তলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। একটি চেয়ারের ওপর মরা ইঁদুরের মাথা। নিচে পড়া সেই মরা ইঁদুর। হাড় গোড় বেরিয়ে গেছে। দেখেই বুঝা গেছে কয়েকদিন আগে মরেছিল ইঁদুরটি। তিন তথা এবং চার তলার টয়লেট ব্যবহার করার মতো নয়। চার তলায় দেয়ালে চুনকামের কাজ চলছে। সেখানে দেয়ালটা ঝকঝক করলেও নিচে ময়লা-আবর্জনা। এক কোনায় ভাঙা ঝাড়– একটি ভাঙা ময়লা ফেলার বক্স পড়ে আছে। এই অবস্থার মধ্যেই ক্লাব কর্মকর্তা ও ফুটবলারদের খেলা দেখতে হয় দ্বিতীয় বিভাগ লিগের।
অথচ যখন এখানে বাফুফের এলিট অ্যাকাডেমির ক্যাম্প ছিল তখন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল এই তিন তলা ও চার তলা। এই স্টেডিয়ামে অতীতে ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপসহ বয়সভিত্তিক সাফ ফুটবল এবং এএফসির বয়সভিত্তিক ফুটবল হয়েছিল। বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক নারী ফুটবলের বেশ কয়েকটি ট্রফি জয়ের কৃতিত্ব আছে এই স্টেডিয়ামে। সেখানেই এখন কি বেহালদশা।
কমলাপুর স্টেডিয়ামের সাথে সংশ্লিষ্ট একজন জানান, বিদ্যুতের একটি সকেট খালি পড়ে যায়। তাই ড্রেসিং রুমে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই।’ গৌরীপরের কোচ হারুন ক্ষোভের সাথেই জানান, বুঝি না একটি সকেট লাগাতে কয় টাকা লাগে। প্রতি ম্যাচেই এভাবে কষ্ট পেতে হয় উঠতি ফুটবলারদের।’
খেলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আশা পাশের শত শত ফুটবলার ঢুকে পড়ে মাঠে। তারা মেতে উঠে ফুটবল নিয়ে। ছোট ছোট শিশুদের সাথে তাদের অভিভাবকরাও মাঠে আসেন। লিগের একটি ভেনুতে খেলা শেষে এভাবে শত শত ছেলেদের প্রবেশ নিয়েও ক্ষোভ কোচ হারুনের। জানান, ‘এটা কি লিগের মাঠ নাকি পাড়া-মহল্লার মাঠ। এভাবে কেন ছেলেরা ঢুকে পড়বে স্টেডিয়ামের ভেতর।’
আসলে অপরিকল্পিত নগরায়নের জেরই টানতে হচ্ছে কমলাপুর, মুগদাপাড়া, মানিকনগর, মাণ্ডার বাসিন্দাদের। আশপাশে খেলার কোনো মাঠই রাখা হয়নি। তাই এভাবেই এলাকার ছেলেরা বিকেল বেলায় ফুটবল খেলায় মেতে উঠে কমলাপুর স্টেডিয়ামে। এতে অবশ্য টার্ফের মাঠের ক্ষতি হলেও উঠতি ছেলেরা ফুটবল নিয়ে ব্যস্ত থাকছে- এটা একটা ইতিবাচক দিক।
স্টেডিয়ামের এই দুরাবস্থার সম্পর্কে যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান, আমি এ বিষয়ে অবগত। অচিরেই স্টেডিয়ামের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নের কাজে হাত দেবো।



