কনকনে ঠাণ্ডায় কাবু সারা দেশ। গত দুই সপ্তাহ ধরে সেই যে পুরো দেশ কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে, তা এখনো অব্যাহত আছে। সারা দিনেও সূর্য স্পষ্ট করে দেখা যায় না। কনকনে ঠাণ্ডায় বেড়েছে ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ। হাঁপানি, কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া শুরু হয়েছে সারা দেশেই। কুয়াশার কারণে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। নির্বাচনী ডামাঢোলে এবার বস্ত্রহীন দরিদ্র মানুষের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসার মানুষ খুবই পরিলক্ষিত হয়েছে। ঢাকা শহরেই কয়েক হাজার মানুষ রাতে খোলা আকাশের নিচে নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ঈশ্বরদীতে ৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
এবার ঠাণ্ডাটা একেবারেই ব্যতিক্রম। গড় তাপমাত্রায় খুব বেশি পতন নেই কিন্তু ঠাণ্ডার মাত্রাটা একেবারেই অন্য রকম। মার্কিন প্রবাসী ক্লাইমেট চেঞ্জ বিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরী গত নভেম্বরে নয়া দিগন্তকে দেয়া সাক্ষাৎকারে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন ‘এবারের শীতকালে ঠাণ্ডার প্রকোপটা একটু বেশিই থাকতে পারে’। বস্তুত এবারের ঠাণ্ডা খুবই ব্যতিক্রম। যেমন ঠাণ্ডার দেশ কানাডায় দীর্ঘ অবস্থান করেছিলেন বা করছেন এমন অনেকেই বলছেন, ‘কানাডার ঠাণ্ডার চেয়ে বাংলাদেশে এবারের ঠাণ্ডা একটু ব্যতিক্রম। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এবার কুয়াশা যেমন একনাগাড়ে দুই সপ্তাহের বেশি দিন ধরে অব্যাহতভাবে চলছে। সামনের আরো কমপক্ষে এক সপ্তাহ এটা অব্যাহত থাকতে পারে। কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের তাপমাত্রার খুব বেশি পার্থক্য থাকছে না। সাধারণত শীতের সূর্যালোক থাকলে একটু শুকনো পরিবেশে দিনের ঠাণ্ডাটা বেশ উপভোগ্য হয়ে থাকে তবে রাতে কুয়াশার কারণে ঠাণ্ডার অনুভূতি বেশি থাকে। কিন্তু চলতি শীতে সারা দিনই কুয়াশায় সর্বত্রই সবকিছু ভেজা ভেজা লাগে এবং দিন ও রাতে একই রকম ঠাণ্ডা অনুভূত হচ্ছে। আবহাওয়ার জানুয়ারি মাসের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে ১ থেকে ২ টি মাঝারী (৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং তীব্র (৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে শিগগিরই তীব্র শৈত্যপ্রবাহের অভিজ্ঞতা পেতে পারে বাংলাদেশের মানুষ।
চলতি কুয়াশা সম্বন্ধে আবহওয়া বিশেষজ্ঞ কানাডা প্রবাসী মোস্তফা কামাল বলেন, গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদীর ওপরে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে দেশের ৮টি বিভাগের জেলাগুলোর আকাশ মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যেতে পারে। আজ রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা বিভাগের বেশি ভাগ জেলাগুলোতে দুপুর ১২টার আগে সূর্যের আলো দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলোতে কুয়াশা হালকা পরিমাণে পড়বে, এ কারণে এই দুই বিভাগে সকাল ১০টার আগেই সূর্যের আলো দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গতকাল সোমবার বেলা দেড়টায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কৃত্রিম ভূউপগ্রহ থেকে প্রাপ্ত কুয়াশার চিত্র বিশ্লেষণ করে শুধুমাত্র বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা ছাড়া অন্য সব জেলার ওপরে কুয়াশার উপস্থিতি ছিল। সারা দিন রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, ময়মনসিংহ, ঢাকা, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার ওপরে কুয়াশার ছিল।
ফলে এসব বিভাগের নদ-নদীতে চলাচল করা নৌযানগুলোকে গতি নিয়ন্ত্রণ করে খুবই সাবধানতার সাথে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
শীতে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চল গরম কাপড়ের জন্য হাপিত্যেশ
রংপুর ব্যুরো জানায়, পৌষের তৃতীয় সপ্তাহে বাতাসের আর্দ্রতা সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ কাছাকাছি আসায় হাত-পা হিম হয়ে আসা শৈত্যপ্রবাহ আর কুয়াশা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রংপুরসহ পুরো উত্তরাঞ্চল। পাওয়া যাচ্ছে না রোদের নাগাল। এতে নাস্তানাবুদ হয়ে পড়েছে জনজীবনের পাশাপাশি গৃহপালিত জীবজন্তুও। নিউমোনিয়া, সর্দিজ্বরসহ ঠাণ্ডাজনিত রোগ হু হু করে বাড়ছে। বিপরীতে মিলছে না পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। গরম কাপড়ের জন্য চলছে হাপিত্যেশ। এর মধ্যে রংপুরে সাড়ে ২২ হাজার কম্বলসহ উত্তর জনপদে মাত্র দেড় লাখ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের থেকে মাত্র ১ দশমিক ২৫ ভাগ। শীতের কারণে দিশেহারা ছিন্নমূল ও দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ কাজকর্ম বাদ দিয়ে বাড়িতে অলস সময় কাটাচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারিভবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সচেতনমহল। গত ১০ দিন থেকে এ অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০-১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। অন্য দিকে আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে ভর্তির কোনো তথ্য না থাকলেও ঠাণ্ডায় এ বিভাগের হাসপাতালগুলোতে ভর্তিদের মধ্যে গত দুই মাসে মারা গেছেন ২০ জন।
প্রতিদিনই নামছে আবহাওয়ার পারদ : রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজার রহমান নয়া দিগন্তকে জানান, পৌষের প্রথম দিন (১৬ ডিসেম্বর ২৫) থেকে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ক্রমেই কমেছে। গতকাল দিনাজপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এ ছাড়া নীলফামারীর ডিমলায় ১২, সৈয়দপুরে ১২ দশমিক ২, রংপুরে ১২ দশমিক ৫, পঞ্চগড়ের তেতুলিয়ায় ১২ দশমিক ৮, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৩, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১৩ দশমিক ৪ ও গাইবান্ধায় ১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। গত ১ জানুয়ারি পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমে এসেছিল ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, বাতাসের আর্দ্রতা কাছাকাছি হওয়ায় বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হতে না পারায় সূর্যের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে সেটাও উত্তাপবিহীন। সাথে ঝরছে কুয়াশা বৃষ্টি। জানুয়ারি মাসে এবার কোথাও কোথাও একটানা ১২ দিনেরও বেশি সূর্যের দেখা নাও মিলতে পারে। ৪-৭টি মৃদু ও ২-৩টি তীব্র শৈত্যপ্রবাহের দেখা মিলতে পারে উত্তরাঞ্চলে। তাপমাত্রা নামতে পারে ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
মাঘ মাস আসার আগেই বাঘ কাঁপানো শীত শুরু : এবার মাঘ মাস আসার আরো ৯ দিন বাকি থাকলেও এরই মধ্যে এ অঞ্চলে শীত জেঁঁকে বসে জোঁকের মতো। ঠিক মাঘের শীতে বাঘ কাঁপানোর অবস্থা। এখন শীত, কুয়াশা বৃষ্টি ও শৈত্যপ্রবাহে কাহিল মানুষ, জীবজন্তু সবাই। গত ২১ দিন ধরে এ অঞ্চলে শীতের প্রকোপ এতটাই বেশি যে, হাত-পা শীতল হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ঘর থেকে বেরোতে পারছেন না। জনজীবনের স্বাভাবিক যাত্রায় পড়েছে ভাটা। গরু-ছাগলসহ গৃহপালিত পশুর অবস্থা একেবারেই কাহিল। কাজকর্মে নেমে এসেছে নজিরবিহীন স্থবিরতা।
ঠাণ্ডাজনিত রোগী বাড়ছে : প্রচণ্ড শীতের কারণে নারী, বৃদ্ধ ও শিশুদের ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই মারাত্মকভাবে বেড়েছে। প্রতিদিন শত শত রোগী এ অঞ্চলের রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ, জেলা ও উপজেলা সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন, অনেকেই ভর্তি হচ্ছেন।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান ডা: আয়শা খাতুন জানান, গত তিন দিনে এ ওয়ার্ডে ঠাণ্ডাজনিত রোগ নিয়ে ৪৯৭ জন ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, বাতজ্বর, আমাশয়সহ শীতজনিত রোগের শিশু আউটডোরেও চিকিৎসা নিচ্ছে। গুরুতরদের ওয়ার্ডে ভর্তি করা হচ্ছে।
রমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ঠাণ্ডার প্রকোপ বেশি হওয়ায় হাসপাতালে শীতজনিত রোগীসংখ্যা ক্রমাগতভাবে বাড়ছে। এদের মধ্যে শিশু ও বৃদ্ধদের সংখ্যা বেশি। আক্রান্তদের বেশির ভাগই ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, অ্যাজমা আক্রান্ত। আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি, পাশাপাশি পরামর্শ দিচ্ছি বৃদ্ধ এবং শিশুদের যেন দ্রুত ঘুমাতে এবং দেরিতে ওঠানো হয়। গত ১ ডিসেম্বর থেকে সোমবার পর্যন্ত ঠাণ্ডাজনিত রোগে ভর্তি হয়ে এ হাসপাতালে সাতজন বয়স্ক এবং ৯ শিশু মারা গেছে।
রংপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা: শাহীন সুলতানা জানান, শীত মৌসুমকে সামনে রেখে মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত আছে। এ ছাড়াও শীতের এ সময়ে শিশুদের একটু সমস্যা বেশি হয়। সে কারণে শিশুদের গরম কাপড় গায়ে রাখতে হবে। শিশুরা যেন ঠাণ্ডায় না থাকে সে কারণে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: গওসুল আজিম চৌধুরী জানান, এখন পর্যন্ত ঠাণ্ডাজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তির অবস্থা স্বাভাবিক। গত ১ নভেম্বর থেকে সোমবার (৫ জানুয়ারি) পর্যন্ত রংপুর বিভাগের উপজেলা ও জেলা হাসপাতালগুলোতে ঠাণ্ডাজনিত রোগে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে চার জন মারা গেছে।
গরম কাপড়ের জন্য হাপিত্যেশ : উত্তরাঞ্চলের জেলা প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, শীতের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এ অঞ্চলের প্রতিটি জেলায় গড়ে প্রায় ২০ হাজার করে মোট এক লাখ ৬০ হাজার কম্বল বরাদ্দ দেয় সরকার। সে সব কম্বল জেলা, উপজেলা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ভাগ করে দিয়ে বিতরণ করা হয়েছে। জানুয়ারি মাসে তীব্রতা বাড়ায় প্রতি জেলা থেকে আরো কম্বলের চাহিদা পাঠানো হয় প্রধান উপদেষ্টার দফতর এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে; কিন্তু সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া এসব কম্বল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে সরকারি হিসাবেই এ অঞ্চলে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪০ লাখ। যাদেরকে সরকার ভিজিএফ-ভিজিডিসহ সরকারিভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর নানা প্রকল্পের মাধ্যমে সহযোগিতা করে থাকে। আর বেসরকারি হিসেবে উত্তরের ১৬ জেলায় সাড়ে আট হাজার বস্তিসহ প্রায় এক কোটি অতিদরিদ্র মানুষ বসবাস করে। সে হিসেবে এ অঞ্চলে সরকারের বরাদ্দ দেয়া কম্বল চাহিদার মাত্র ১ দশমিক ২৫ ভাগ মাত্র।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারিভাবে শীতার্তদের পাশে সে ভাবে দাঁড়াতে পারছেন না মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি উদ্যোগও চোখে পড়ার মতো নয় এবার। সরকারি ও বেসরকারি তরফে কম্বল সরবরাহ এ অঞ্চলের জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষজন কম্বলের জন্য হাহাকার করছেন।



