নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর আদাবরের বালুরমাঠ এলাকায় একটি সরু খাল। সেই খালের চার দিকে ময়লা-আবর্জনায় ভরা। বাঁশের সাঁকোতে সাধারণ মানুষের চলাচল করার সময় বিকট দুর্গন্ধ নাকমুখ আটকে যাওয়ার অবস্থা। কেউ একজন ডোবায় চোখ পড়ে একটি ব্যাগের ওপর। ব্যাগটি সন্দেহ হলে কয়েকজনকে নিয়ে টেনে উপরে উঠিয়ে এনে ব্যাগ খুলতেই বেরিয়ে আসে একটি খণ্ডিত হাত। মুহূর্তেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে হইচই। এরপর পুলিশে খবর দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পুরো ব্যাগটি খোলার পর একে একে বেরিয়ে আসে হতভাগা নারীর খণ্ড খণ্ড দেহ। এরপর মাথাটিও বেরিয়ে আসে। ওই বস্তা থেকে মস্তকসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের টুকরা বের করা হয়। তবে লাশটি কোন হতভাগা নারীর তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নৃশংসতার এমন দৃশ্য দেখে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক দেখা যায়। অনেকে বলছেন কী দোষ ছিল এই নারীর। কেনই বা তাকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর আদাবরের বালুরমাঠ ১০ নম্বর এলাকায় ওই হতাভাগা নারীর মস্তকবিহীন, হাত-পা বিচ্ছিন্ন লাশের টুকরো অংশ উদ্ধার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা অজ্ঞাত ওই নারীকে নৃশংভাবে হত্যার পর খুনিরা লাশ বস্তাবন্দী করে ডোবায় ফেলে গেছে। শুধু আদাবরেই নয়, গতকাল দুপুরে রাজধানীর লালবাগের শহীদনগর এলাকায় একটি বাসায় মো: আনোয়ার হোসেন নামে এক আইনজীবীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মৃত্যুকে রহস্যজনক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অন্য দিকে গতকাল দুপুরে রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাথে এবং কদম ফোয়ারা মোড়ের ফুটপাথ থেকে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানীতে চার লাশের সংবাদে সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্কের নগরী হিসেবে পরিণত হয়েছে ঢাকা।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান বলেন, অজ্ঞাত ওই নারীকে কেউ হত্যার পর লাশ টুকরো টুকরো করে বস্তায় ফেলে গেছে। পুলিশ লাশের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠনোর চেষ্টা করছে। পরিচয় নিশ্চিত হতে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফরেনসিক বিভাগ ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনসহ (পিবিআই) অন্যন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত আছে। তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে ওই নারীর পরিচয় ও খুনিদের গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
লালবাগে আইনজীবীর লাশ : গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লালবাগ থানাধীন শহীদনগরের বউবাজার ৩ নম্বর গলির ১০/১ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ভাড়া বাসা থেকে মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নামে এক আইনজীবীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। দুই থেকে তিন দিন আগে তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা পুলিশের।
পাশের কক্ষের এক ভাড়াটিয়া পচা গন্ধ পেয়ে তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখেন মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। পরে তিনি পুলিশে খবর দেন। পরে লালবাগ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনি কার্যক্রম শুরু করে। সেখানে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জজ কোর্টের আইনজীবী ছিলেন। ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ের প্রথম তলার ২১৪ নম্বর কক্ষে তার চেম্বার। তিনি ওই বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে একাই থাকতেন। তার পরিবার গ্রামে থাকে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে পুলিশ।
লালবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ জামিল হোসেন বলেন, আনোয়ার হোসেন জজ কোর্টের অ্যাডভোকেট। তিনি ওই বাসায় ব্যাচেলর হিসেবে থাকতেন।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, লাশটি দুই থেকে তিন দিন আগের। তার ড্রাইভিং লাইসেন্স পুলিশের কাছে রয়েছে। সেটি যাচাই করে পরিবারের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।
পুলিশের সুরতহালসহ প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম চলছে। ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
ফুটপাথে পড়েছিল দুই লাশ : রাজধানীর শাহবাগের জাতীয় ঈদগাহ ও হাইকোর্ট মাজারসংলগ্ন পৃথক স্থান থেকে দুই অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার দুপুরে লাশ দু’টি উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। নিহত দু’জনের মধ্যে একজনের বয়স আনুমানিক ৬৫ বছর এবং অপরজনের বয়স প্রায় ৪৫ বছর। তাদের কারো ঠিকানা বা পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পুলিশ জানায়, গতকাল বেলা ১১টা ৫০ মিনিটের দিকে সুপ্রিম কোর্টসংলগ্ন হাইকোর্ট মাজার ও জাতীয় ঈদগাহ এলাকার দু’টি পৃথক স্থানে দুই ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখেন পথচারীরা। এর মধ্যে একজনকে শিক্ষাভবনের বিপরীত পাশে সুপ্রিম কোর্টের পানির পাম্পের কাছে এবং অপরজনকে জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের উত্তর পাশে বটগাছের নিচে ফুটপাথের ওপর পড়ে থাকতে দেখা যায়। ওই স্থানটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিপরীত পাশে।
শাহবাগ থানার এসআই তৌফিক হাসান ঘটনাস্থলে গিয়ে দু’জনকে উদ্ধার করেন।
এসআই তৌফিক হাসান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে নিহত দু’জন ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন। লাশ দু’টির পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। ময়নাতদন্তের জন্য সেগুলো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা হয়েছে। পুলিশ লাশ দু’টির পরিচয় শনাক্ত ও মৃত্যুর কারণ জানতে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যক্রম চালাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গতকাল ১০টায় ফরিদপুরের মধুখালীতে ধানক্ষেতের পাশ থেকে তিনটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরা এক অজ্ঞাত পুরুষের ছয় টুকরো খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশের বিচ্ছিন্ন অংশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। লাশটি মধুখালী উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া গ্রামের বোয়ালিয়া বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন ফরিদপুর-মাগুরা মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়াও গত শুক্রবার গাজীপুরের জয়দেবপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের একটি কালভার্টের নিচ থেকে লাগেজে ভরা অজ্ঞাত এক নারীর অর্ধগলিত লাশের খণ্ডাংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরে আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে বস্তাবন্দী অবস্থায় লাশের অন্যান্য অংশও উদ্ধার করা হয়। পুলিশ শরীরের খণ্ডিত অংশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠিয়েছে।



