ব্যাংক খাতের পর এবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযানে নামছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক রেজুলেশনের আওতায় চলতি মাসেই তিনটি সঙ্কটাপন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ফ্যাস (এফএএস) ফাইন্যান্স, আভিবা ফাইন্যান্স এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক ঊর্ধ্বতন সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে একটি নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ বুধবার অনুষ্ঠেয় এক বৈঠকে এ বিষয়ে অনুমোদন পেলে আগামীকালই প্রশাসক নিয়োগের আদেশ জারি হতে পারে। একই সাথে প্রশাসক নিয়োগ, ক্ষমতা, দায়িত্ব ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নির্ধারণে একটি পৃথক নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা পর্ষদের দুর্বলতা, ঋণ জালিয়াতি, তারল্য সঙ্কট, আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতা এবং মূলধন ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। স্বাভাবিক তদারকির মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব না হওয়ায় প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণপোর্টফোলিও কার্যত ধসে পড়েছে। ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আভিবা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণখেলাপি। অর্থাৎ, বিতরণ করা প্রায় সব ঋণই আর ফেরত আসছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নেই। তাই বোর্ড বিলুপ্ত করে প্রশাসকের মাধ্যমে সম্পদের প্রকৃত হিসাব, দায়-দেনা নিরূপণ, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ নেয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিবা ফাইন্যান্স, ফ্যাস (এফএএস) ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ে প্রায় ২৭ হাজার আমানতকারীর প্রায় দুই হাজার ৭০০ কোটি টাকা আটকে আছে। প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ফ্যাস ফাইন্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবিড় নজরদারিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শনে উঠে এসেছে- জাল ও ভুয়া কাগজপত্রের ভিত্তিতে ঋণ অনুমোদন; একই গ্রুপকে সীমা অতিক্রম করে ঋণ প্রদান; পরিচালকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন ও উচ্চ ঝুঁকির ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে কয়েক বছর আগে সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠে আসে। পরবর্তীতে দুর্নীতি দমন কমিশনও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে আট কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের মামলা করে। এ ছাড়া একাধিক ব্যাংক, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ব্যাংক, ফার্স্ট ফাইন্যান্সে রাখা আমানত ফেরত পেতে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরে আসে।
বর্তমান আভিবা ফাইন্যান্সের আগের নাম ছিল রিলায়েন্স ফাইন্যান্স। বাংলাদেশে ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির মূল ব্যক্তি পি কে হালদার এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। পরবর্তীতে দুদকের তদন্তে উঠে আসে, তিনি ও তাঁর সহযোগীরা জাল ঋণের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত, যার মধ্যে রিলায়েন্স (বর্তমান আভিবা), ফ্যাস ফাইন্যান্স, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, পিপলস লিজিংসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে আরো উঠে আসে-আবেদন ছাড়াই ঋণ অনুমোদন; একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানে শত শত কোটি টাকা বিতরণ; দুর্বল বা কৃত্রিম জামানত গ্রহণ; প্রকৃত আর্থিক অবস্থার তথ্য গোপন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি, যা পুরো আর্থিক খাতের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ।
অপর দিকে, ফারইস্ট ফাইন্যান্সও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ তদারকিতে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে- বড় গ্রাহকদের কাছে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূত; যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই ঋণ বিতরণ; দীর্ঘদিন ধরে ঋণ আদায়ে ব্যর্থতা ও নগদ অর্থের তীব্র সঙ্কট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮.৫০ শতাংশ ঋণ খেলাপি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির ঋণসম্পদের প্রায় পুরো অংশই অকার্যকর হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক পরিদর্শন, বিশেষ নিরীক্ষা এবং তদারকিতে এনবিএফআই খাতে যেসব অনিয়ম ধারাবাহিকভাবে ধরা পড়ে, তার মধ্যে রয়েছে- প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাংক খাতের একসময়ের মাফিয়া এস আলমসহ একাধিক রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারা ঋণের নামে বিনা বাধায় জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রাখা আমানত বের করে নিয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে ভুয়া বা অতিমূল্যায়িত জামানত রাখা হয়েছে। কাগুজে কোম্পানিকে ঋণ; ঋণের অর্থ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া; প্রকৃত খেলাপি ঋণ গোপন করতে পুনঃতফসিলের অপব্যবহার; আমানতের অর্থ দিয়ে পুরনো দায় পরিশোধ করার মতো ঘটনা ঘটেছে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এসব কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূলধন কার্যত শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, নীতিমালা অনুযায়ী প্রশাসক দায়িত্ব নেয়ার পর পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতা স্থগিত করবেন। সব বড় ঋণ পুনঃপর্যালোচনা করবেন; প্রয়োজন হলে ফরেনসিক অডিট করবেন; সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করবেন; দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা সুপারিশ করবেন; বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসক নিয়োগের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা নয়; বরং আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধার এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। এটাই বাস্তবায়ন করবেন প্রশাসকরা।



