কৃষিজমিতে অবৈধ সিসা কারখানা

ময়মনসিংহে ব্যাটারি পোড়ানোর ধোঁয়ায় হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও ফসল

Printed Edition
সিসা কারখানায় দিনে কাজ করছেন শ্রমিকরা : নয়া দিগন্ত
সিসা কারখানায় দিনে কাজ করছেন শ্রমিকরা : নয়া দিগন্ত

মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ

ময়মনসিংহের ত্রিশালে কৃষিজমি দখল করে পুরনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। উপজেলার দুইটি এলাকায় গড়ে ওঠা এসব অবৈধ কারখানায় দিনের বেলায় পুরনো ব্যাটারি ভেঙে অ্যাসিড, সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। আর রাত নামলেই মাটির গর্তে এসব উপাদান পোড়ানো হয়। এতে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র ঝাঁঝালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক। দূষিত হচ্ছে মাটি, পানি ও বায়ু। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষিজমি ও ফসল। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন আশপাশের মানুষ।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে কারখানা দুইটির মালিকপক্ষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় কৃষিজমিতে এমন পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম চললেও প্রশাসন থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের মনে।

গতকাল শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা এলাকায় একটি ইটভাটার পাশে কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে সিসা তৈরির কারখানা। সেখানে পুরনো ব্যাটারি সংগ্রহ করে শ্রমিকেরা সেগুলো ভেঙে সিসা ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করছেন। একইভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসংলগ্ন বৈলর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ডেও চলছে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির কাজ। দুইটি কারখানায় প্রায় অর্ধশত শ্রমিক কাজ করছেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য- দিনের বেলায় ব্যাটারি ভেঙে অ্যাসিড, সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। পরে রাতের আঁধারে এগুলো পোড়ানো হয়। এ সময় চার পাশে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত ধোঁয়া ও কারখানার বর্জ্য আশপাশের কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ায় ধানগাছসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা বলেন, রাতে বর্জ্যগুলো পোড়ানোর সময় এর বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়।

বৈলর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছাইফুল ইসলাম ফরাজী বলেন, কয়েক মাস আগে কৃষিজমিতে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির কারখানা গড়া হয়েছে। সারারাত সিসা পুড়ানোর সময় এলাকায় অসহনীয় ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

কারখানার ম্যানেজার আবুল কালাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘এটি বৈধ নয়, তবে অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। এখনো সব কাগজপত্র তৈরি করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি অবশ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির অভিযোগ অস্বীকার করে করেন, ‘এতে কোনো ক্ষতি হয় না। তবে, প্রশাসন ও এলাকার সবাইকে ম্যানেজ করেই এই ব্যবসা পরিচালনা করছি।’

বৈলর ইউনিয়নের কারখানার মালিক বিল্লালকে কারখানার বৈধ কাগজপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এটা নিয়ে নিউজ করতে হবে না।’ পরে বৈধ কাগজপত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা তো কৃষিজমিতে সরকার অনুমোদন দেয় না।’ এ বিষয়ে পরে সন্ধ্যায় কথা বলার প্রস্তাব দেন তিনি।

হরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শামসুজ্জামান মাসুম বলেন, সিসা কারখানার বিষয়টি তাদের গোচরে নেই। কারখানাটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স নেয়নি। বিষয়টি নিয়ে এলাকার কৃষকেরাও ক্ষুব্ধ বলে জানান তিনি।

ত্রিশাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, কৃষিজমিতে সিসা ও অ্যাসিড পোড়ানো কিংবা ফেলার ফলে ফসলের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

ত্রিশাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়েছি। ওই অবৈধ কারখানা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ পরিবেশ অধিদফতর, ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো: নাজমুল হুদা বলেন, সিসা তৈরির কারখানা দুইটি অবৈধ। এগুলোর কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। কারখানা দু’টি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু কারখানা বন্ধ করলেই হবে না। কৃষিজমিতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা ও ব্যাটারি পোড়ানোর কারণে মাটি, পানি ও ফসলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সাথে কারখানাগুলোর পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তারা।