বিবিসি
মিয়ানমারে সাম্প্র্রতিক নির্বাচনের পর গত ছয় মাসে সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জাতিসঙ্ঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, জান্তা সরকারের দমন-পীড়নে এই সময়ের মধ্যে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
জাতিসঙ্ঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু রয়েছে, যা দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরো তীব্র হয়েছে। একই সাথে জান্তা বাহিনীর নির্বিচার বিমান হামলায় প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বহু মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন।
সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয়েছে সাগাইং অঞ্চল। শুধু এই এলাকাতেই সামরিক অভিযানে ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-উ এলাকায় একটি বিদ্যালয়ের সামনে জনসমাগমে বিমান হামলায় চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হন। এ ছাড়া ডিসেম্বরে তাবায়িন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে হামলায় আরো ১৯ জন প্রাণ হারান।
জাতিসঙ্ঘের রিপোর্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর আরাকান আর্মির নির্যাতন ও জোরপূর্বক সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণ একদিকে সামরিক বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর থেকেও ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, আন্তর্জাতিক তহবিল কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। পাঁচ বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী অং সান সু চি-কে আটক করে ক্ষমতা দখল করা জান্তা বাহিনী বর্তমানে কঠোর সামরিক আইন ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে। এ দিকে গত এপ্রিলে অভ্যুত্থানের নেতা মিন অং হ্লাইং নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন। তার সমর্থকদের নিয়ে গঠিত সংসদে জান্তাপন্থী দল প্রায় ৮০ শতাংশ আসনে জয় পেয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলছে, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে মিয়ানমারের চলমান মানবিক সঙ্কট আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোয় জোর চীনের
সিনহুয়া জানায়, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে বেইজিংয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্য দিকে মিয়ানমার তাদের দেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিক ও প্রকল্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বেইজিং তাদের প্রতিবেশী কূটনীতিতে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ককে সব সময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, চীন অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিতে বিশ্বাসী এবং মিয়ানমারের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় বেইজিংয়ের সমর্থন বজায় থাকবে। চলতি বছর চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-৩০) শুরু হওয়ার কথা উল্লেখ করে শি জিনপিং বলেন, চীন তার উন্নয়নের অভিজ্ঞতা মিয়ানমারের সাথে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা সমন্বয় এবং জনগণের পারস্পরিক মেলবন্ধনের মাধ্যমে দুই দেশের একটি ‘যৌথ ভবিষ্যৎ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
মিয়ানমারের সাথে চীনের দীর্ঘতম সীমান্ত রয়েছে উল্লেখ করে শি জিনপিং পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে দুই দেশের ঐক্য ও সহযোগিতা আরো সুদৃঢ় করার ওপর জোর দেন।
বৈঠকে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের আওতায় ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ (সিএমইসি) বাস্তবায়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এটিকে দুই দেশের সহযোগিতার একটি ‘ফ্ল্যাগশিপ’ বা প্রধান প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই করিডোরের আওতায় থাকা মূল প্রকল্পগুলোর নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া উচিত, যা মিয়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া মিয়ানমারে সাম্প্রতিক ভূমিকম্প-পরবর্তী পুনর্গঠন কাজে চীন সহায়তা বাড়াতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধান মিন অং হ্লাইং চীনের এই দীর্ঘমেয়াদি ও নিঃস্বার্থ সহায়তার জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, চীনের পঞ্চদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা মিয়ানমারের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে। মিয়ানমার এই করিডর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরো বাড়াতে আগ্রহী।
উভয় নেতাই সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন। বিশেষ করে উত্তর মিয়ানমারে চলমান অস্থিরতা নিরসনে সব পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি ও সমঝোতার পথ খোঁজার আহ্বান জানিয়েছেন শি জিনপিং। তিনি বলেন, উত্তর মিয়ানমারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা দুই দেশেরই স্বার্থ রক্ষা করবে।
এ ছাড়া সীমান্তে অপরাধমূলক কার্যক্রম দমনে যৌথ অভিযানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। দুই দেশই সম্মত হয়েছে যে অনলাইন জুয়া, টেলিকম জালিয়াতি, মাদক পাচার প্রতিরোধে যৌথ পদক্ষেপ জোরদার করা হবে। মিন অং হ্লাইং স্পষ্ট করে বলেন, মিয়ানমারে কর্মরত চীনা প্রতিষ্ঠান এবং তাদের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। তিনি বেইজিংয়ের ‘এক চীন নীতি’র প্রতি মিয়ানমারের অবিচল সমর্থনের কথা আবার নিশ্চিত করেন। বৈঠক শেষে দুই দেশের শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে পরিবহন, যোগাযোগ এবং জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে গ্রেট হল অব দ্য পিপলের নর্দার্ন হলে মিয়ানমারের রাষ্ট্রপ্রধান মিন অং হ্লাইংকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলের সম্মানে একটি মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই সফর চীন ও মিয়ানমারের মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ককে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।



