আসাদুল ইসলাম সবুজ লালমনিরহাট
তিস্তা ও ধরলা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের চিরচেনা দৃশ্যপট বদলে গেছে। যেখানে বছরের পর বছর ধরে শুধু তামাকের বিষাক্ততার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন ফুটেছে সোনালি সূর্যমুখীর হাসি। লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ও মহিষখোচা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল এখন হলুদে রাঙা। দূর থেকে দেখে মনে হয় যেন বিশাল হলুদের গালিচা বিছানো। কাছে গেলে বাতাসে দোল খাওয়া সূর্যমুখী ফুলের সৌন্দর্য যেন আগত দর্শনার্থীদের মনমুগ্ধ করে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্ষার শেষে চরাঞ্চলে জেগে ওঠা জমিগুলোকে চাষাবাদের আওতায় আনতে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয় চর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এ প্রকল্পের আওতায় পরিত্যক্ত ও তামাকচাষের জমিতে সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষকদের মাঝে প্রদর্শনী প্লট দেয় কৃষি বিভাগ। কৃষকরা শুধু জমি ও পরিশ্রম দিয়েছেন; বীজ, সার ও অন্যান্য খরচ বহন করেছে প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তেলজাতীয় ফসল চাষে আগ্রহী করে তোলা।
এ প্রকল্পের আওতায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আদিতমারী উপজেলার পাঁচজন কৃষক সূর্যমুখী চাষ শুরু করেন। মহিষখোচা ইউনিয়নে তিনজন এবং দুর্গাপুর ইউনিয়নে দুইজন মিলে প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও এসেছে আশাব্যঞ্জক। এ সাফল্যে কৃষকের মুখে এখন প্রশান্তির হাসি।
চরাঞ্চলের কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রথমে নতুন ফসল ফলানো নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন তিনি। দীর্ঘ দিন তামাক চাষ করলেও সূর্যমুখী ছিল সম্পূর্ণ অজানা এ ফসল। তবে, প্রদর্শনী প্রকল্পের আওতায় সব খরচ কৃষিবিভাগ বহন করায় তার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বলেন, ‘স্বল্প খরচে অধিক মুনাফা পেতে সূর্যমুখীর বিকল্প নেই। আমার এ ক্ষেত দেখে অনেক কৃষক আগামীতে তামাক ছেড়ে সূর্যমুখী চাষের স্বপ্ন দেখছেন।’ তিনি আরো জানান, বিঘাপ্রতি সূর্যমুখী চাষে খরচ হয় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। উৎপাদন হয় ছয় থেকে সাত মণ। প্রতি মণ চার হাজার টাকা দরে বিক্রি করলে খরচ বাদে বিঘাপ্রতি ২০ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। বীজ বপন করে দুই-তিনবার সার ও সেচ দিলেই পরিচর্যার কাজ শেষ।
অন্যদিকে, এলাকার তামাক চাষি আজিজুল হকের জানান, ‘আমরা কৃষক, লাভজনক ফসল চাই। স্বাস্থ্যহানি হলেও লাভের আশায় আমরা তামাক চাষ করি। সূর্যমুখীর খরচ কম। যদি বাজার ভালো থাকে, তবে আগামীতে তামাক ছেড়ে এ ফসল চাষে অবশ্যই আমরা আগ্রহী হয়ে উঠব। তবে প্রথমবার সূর্যমুখী চাষ হওয়ায় দর্শনার্থীদের ভিড় কিছুটা সমস্যারও সৃষ্টি করছে। অনেকে ফুল দেখে ফুল ছিড়ছে, ক্ষেতের ভেতর গিয়ে গাছ ও ফুল নষ্ট করছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, ‘অন্যান্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখীর গুণাগুণ ভালো এবং রোগবালাই কম থাকায় ফলন বেশি হয়। সূর্যমুখী থেকে প্রাপ্ত তেল মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। সরকার কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে বিনামূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করছে। তেলজাতীয় এ ফসল কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’ প্রথমবারের এ সাফল্য তিস্তা চরের বিষমুক্ত ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কৃষকদের মধ্যে সৃষ্ট আগ্রহ যদি কাজে লাগে, তবে একদিন হয়তো তিস্তা চরের তামাকের বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্তি মিলবে। সেখানে ফুটবে শুধুই সোনালি সম্ভাবনার সূর্যমুখী।


