রংপুর ব্যুরো
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তার বৈধ আয়ের চেয়ে ২০০ গুণেরও বেশি সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। কুড়িগ্রাম, রংপুর ও ঢাকায় এই কর্মকর্তার নামে-বেনামে প্রায় শতকোটি টাকার সম্পদের তথ্য এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি এই সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের নথিপত্র ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অঢেল অবৈধ সম্পদের তথ্য সামনে আসা এবং জেলা প্রশাসনের তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও তিনি পদে বহাল রয়েছেন।
দুদকে জমা হওয়া অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর মহানগরীর রাধাবল্লভ এলাকায় মনিরুজ্জামানের ‘জান্নাত’ নামে ৫ কোটি টাকা মূল্যের একটি তিনতলা বাড়ি রয়েছে। এ ছাড়া নগরীর কলেজ রোডে ৩ কোটি টাকার ‘মুনিবা ছাত্রাবাস’, বিনোদপুরে ৬০ লাখ টাকার সাড়ে ৪ শতক জমি এবং আলমনগর মৌজায় ১ কোটি টাকার ৬ শতকের একটি প্লট রয়েছে। স্ত্রী আরফাতুন নাহারের নামে বিনোদপুর মৌজায় কেনা হয়েছে ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ৭ শতকের প্লট।
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে মাচাবান্দ মৌজায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ৬২ শতক জমি এবং জন্মস্থান মাচাবান্দার আদর্শগ্রামে একটি দোতলা বাড়ি করেছেন তিনি। উলিপুর মৌজায় ১০ লাখ টাকার ৩ শতক জমি এবং স্ত্রীর নামে একই উপজেলার সিদ্ধান্ত মালতী বাড়ি মৌজায় ৩০ লাখ টাকার ১৩ শতক জমি রয়েছে। এর বাইরে কুড়িগ্রাম শহরের শাপলা চত্বরের বাবর টাওয়ারে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ফার্মেসি ব্যবসা ও নিজস্ব ৬টি মাইক্রোবাস রেন্ট-এ-কারে ভাড়ায় চলে বলে জানা গেছে।
রাজধানী ঢাকাতেও গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অ্যাসোসিয়েটেড বিল্ডার্স করপোরেশন লিমিটেডের (এবিসি) কাছ থেকে মিরপুর রূপনগর মিল্কভিটা রোডে কারপার্কিংসহ দুই কোটি টাকা মূল্যের ১,৪৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনেন মনিরুজ্জামান। একই সাথে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত ক্লাবের সদস্য পদও বাগিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি তেলের পাম্প ব্যবসাতেও বড় অঙ্ক বিনিয়োগ করেছেন এবং শ্যালককে বাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন বলে তথ্য মিলেছে। অবৈধ এসব সম্পদ বৈধ করতে তিনি বিভিন্ন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে নামমাত্র লোন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১১ সালের ৭ জুলাই পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় অ্যাডহক ভিত্তিতে পিআইও হিসেবে যোগ দেন মনিরুজ্জামান। ছয় মাস পর চাকরি স্থায়ী হলে দিনাজপুরের কাহারোল ও নবাবগঞ্জ উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪-১৬ সালে নবাবগঞ্জে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১০ কোটি টাকার টিআর ও কাবিখার বিশেষ বরাদ্দের বেশির ভাগ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বগুড়া দুদক কার্যালয় তদন্ত শুরু করলে তা প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপ দেয়ার চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে যোগ দিয়ে তৎকালীন মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ হয়ে সারা দেশে পিআইওদের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন।
বর্তমানে মিঠাপুকুরে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৩-২৪ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও রাস্তা সংস্কারের অন্তত ৩০টি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেন। শুকুরেরহাট ডিগ্রি কলেজ ও শুকুরেরহাট আলিম মাদরাসার ৩ লাখ টাকা করে বরাদ্দ কাগজে-কলমে দেখিয়ে যথাক্রমে ১ লাখ ১০ হাজার ও ১ লাখ ৫ হাজার টাকা প্রদান করে বাকি টাকা পকেটস্থ করেন। সাবেক এমপি জাকির হোসেন সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত টিআর ও কাবিখার ১৪ লাখ টাকা এবং ১৩ টন গমের বরাদ্দও কোনো কাজ না করে ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে তুলে নেন তিনি। কম্পিউটার কেনা ও কার্যালয়ের উন্নয়নের বরাদ্দ করা প্রায় ১৩ লাখ টাকা ভুয়া ভাউচারে আত্মসাৎ করেন।
এমনকি বিভিন্ন সেতু নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ করা প্রায় ৩ কোটি টাকা কোনো কাজ না করেই এনআরবিসি ব্যাংকের মিঠাপুকুর শাখায় নিজ অ্যাকাউন্টে জমা রেখে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিলেন। পরবর্তীতে টাকা তুলে নেয়া হলেও প্রকল্পের বেশির ভাগ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চূড়ান্ত বিল ছাড় দেয়া হয়। এ ছাড়া বন্যা আশ্রয়ণ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের এপিডির দায়িত্বে থাকা অবস্থায়ও কোটি কোটি টাকা অনিয়ম করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, অষ্টম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তার ১৫ বছরে বৈধ বেতন-ভাতা থেকে সর্বোচ্চ ৯০ লাখ টাকা আয় হতে পারে, যার মধ্যে সংসার খরচ বাদ দিলে সঞ্চয় থাকার কথা ৪৫ লাখ টাকার মতো। কিন্তু তিনি শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে তাকে পদে বহাল রাখা দুঃখজনক। তাকে দ্রুত বরখাস্ত করে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া উচিত। অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গেলে কার্যালয়ে মনিরুজ্জামান সরকারকে পাওয়া যায়নি। তবে মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, তার সব সম্পদ বৈধ এবং নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। চাকরির পাশাপাশি ব্যবসা করার নিয়ম আছে কি না- এমন প্রশ্নের তিনি কোনো উত্তর দেননি।
রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া জানান, বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় মাস ছয়েক আগে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মনিরুজ্জামানের আগামী তিন বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত (হেল্ডআপ) করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও দুদক ব্যবস্থা নেবে।
দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো: শাওন মিয়া জানান, প্রাপ্ত অভিযোগ ও তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধান চলছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনও বিষয়টি নিয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।



