- দূষিত নগরীর শীর্ষে বছরজুড়ে
- বেশির ভাগ উদ্যোগ কাগজে কলমে সীমাবদ্ধ
কর্তা আসেন কর্তা যান। রাষ্ট্রের গচ্ছা যায় শত কোটি। তারপরও নগরীর ভাগ্য বদলায় না। দূষণমুক্ত শহরের পরিবর্তে বিশে^র দূষিত নগরীর শীর্ষে বছরজুড়ে আলোচিত হয় ঢাকার নাম। এর কারণ ব্যাখ্যায় বিশ্লেষকরা বলছেন কর্তাদের ব্যর্থতায় দূষণের এমন ব্যাপক মাত্রা নগরবাসীকে ভয়ঙ্কর অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। কারণ এর নিয়ন্ত্রণে সরকারের একাধিক সংস্থা থাকলেও তাদের বেশির ভাগ উদ্যোগ কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। ফলে দূষণের উৎস চিহ্নিত হওয়ার পরও তার নিয়ন্ত্রণে কর্তাদের ব্যর্থতায় দূষণ বেড়েই চলেছে।
বায়ু নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপস বলছে, কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় সময়ের সাথে দিন দিন বায়ুমানের অবনতি হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, সর্বশেষ ২৪ সালের ডিসেম্বরে দূষণ বেড়েছে ৩১ ভাগের বেশি। যা বিগত ৯ বছরে রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন দূষণে শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের রোগ, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, জন্মগত ত্রুটি ও জেনেটিক প্রভাবসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে জন্মগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ছে।
বিগত সময়ের রেকর্ড বলছে দূষণ নিয়ন্ত্রণে পূর্বে গ্রহণ করা সরকারি উদ্যোগের খুবই সামান্য কার্যকর হয়েছে। বাকি সব কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দফতর, আইন এবং প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও কার্যকর বাস্তবায়নহীনতার কারণে দূষণের উৎস ইটভাটা ও কলকারখানার ধোঁয়া, ফিটনেসবিহীন গাড়ি, যত্রতত্র বর্জ্য পোড়ানো, নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণ কাজ এসব উৎস বন্ধে পূর্ণ সফলতা সম্ভব হয়নি।
দূষণের ভয়াবহতা নিয়ে বিশ^ব্যাংক তাদের প্রতিবেদনে বলছে, গত দুই দশকে দেশে দূষণ বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, যার ফলে মানুষের গড় আয়ু সাড়ে পাঁচ বছর কমেছে। বিগত সরকারগুলো দূষণ রোধে নানান উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এক শতাংশেরও কম অগ্রগতি হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, দূষণ সব সময়ই উদ্বেগের। প্রতি বছর বায়ুদূষণ ২ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। তার ভাষ্য, মূলত নভেম্বর থেকে মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ হয়। এর মূল কারণ স্থানীয় ইটভাটা ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম, বর্জ্য পোড়ানো।
গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে তিনি বলেন, দিন যত যাচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয় তত বাড়ছে। তার প্রমাণ বিগত বছরের জানুয়ারি মাসের বায়ুদূষণ আগের আট বছরের জানুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ২৪ দশমিক ৫২ শতাংশ বেশি। আর বছরের ফেব্রুয়ারি মাস দূষণের দিক থেকে ছিল শীর্ষে। যা বিগত আট বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের গড় মানের তুলনায় ১৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ বেশি। এর কারণ পরিবেশ ধ্বংসের উৎস বন্ধে ব্যর্থতা।
দূষণের ভয়াবহতা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম জানান, বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণের কারণে বাতাসেও বিপজ্জনক মাত্রায় সিসার উপস্থিতি দেখা গেছে। এক সময় বাতাসে সিসার ঘনত্ব অনেক বেশি ছিল। তারপরে এটি অনেক হ্রাস পায়। আগে সাধারণত প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৪০০ থেকে ৫০০ ন্যানোগ্রাম পাওয়া যেত। কিন্তু এখন এক হাজারেরও বেশি ন্যানোগ্রাম পাওয়া যাচ্ছে।
অপর দিকে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রব বলেন, সবুজায়ন যেখানে ২৫ শতাংশ এবং পর্যাপ্ত জলাধার নদী নালা খাল বিল থাকার কথা তা উজাড় করে অপরিকল্পিভাবে নতুন নতুন বাণিজ্যিক ভবন, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এতে করে পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এরই মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে ঢাকা স্থান পেয়েছে। তার ভাষ্য, এখনি দূষণের উৎস বন্ধ না হলে আগামীতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের একজন উপপরিচালক নিজেদের ব্যর্থতা অস্বীকার করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পরিবেশ রক্ষা হলো তাদের কাজ। সুতরাং কাজ তারা করছেন না বা তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ এমনটা ঠিক না। তবে তাদের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় প্রভাবশালীদের নানান তৎপরতায় অনেক কিছু বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না। এ জন্য সাধারণ মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন। সে সাথে আইনের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তাহলেই তার পূর্ণাঙ্গ সফলতা সম্ভব।
দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ২৫০ শয্যার টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা: আয়শা আক্তার বলেন, বর্ষাকালে বায়ু ভালো থাকলেও জানুয়ারি- ফেব্রুয়ারিতে দূষণ বেড়ে যায়। এতে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া নিয়ন্ত্রণহীন দূষণে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, জন্মগত ত্রুটি ও জেনেটিক প্রভাবসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সাথে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে জন্মগত সমস্যার আশঙ্কা বাড়ছে।



