হাসান মাহমুদ রিপন সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ)
ডিজিটাল ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার যুগেও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার সাত গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখনো নির্ভর করছে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো ও নৌকার ওপর। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অপেক্ষায় থাকা এসব মানুষের কাছে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এখন অনেকটাই আস্থাহীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
সোনারগাঁও উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের গোলনগর এবং সনমান্দী ইউনিয়নের দৌলরদী গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র নদ দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। দৌলরদী, গোলনগর, কুমারচর, জোয়ারদী, মুছারচরসহ আশপাশের সাতটি গ্রামের বাসিন্দারা প্রতি বছর নিজ উদ্যোগে চাঁদা তুলে শুষ্ক মৌসুমে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করেন। কিন্তু বর্ষা এলেই সেটি পানির নিচে তলিয়ে যায় কিংবা ভেঙে পড়ে। তখন নৌকাই হয়ে ওঠে একমাত্র ভরসা।
সরেজমিন দেখা গেছে, বর্ষার পানিতে সাঁকোর বড় অংশ ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও ভেঙেও পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, নারী ও রোগীদের প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় পারাপার হতে হচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বৈরী আবহাওয়ায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, ছোটবেলা থেকে এই সাঁকো দেখছি। এখন বয়স ৫০ পেরিয়েছে, কিন্তু একটি সেতুও নির্মাণ হলো না। নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়, পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না।
কলেজ শিক্ষার্থী সিফাত ও মহিউদ্দিন জানান, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে কলেজে যেতে হয়। সম্প্রতি এক সহপাঠী সাঁকো থেকে পড়ে আহত হয়েছে। বর্ষাকালে নৌকায় চলাচল করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক সময় ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নেয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
শুধু যাতায়াত নয়, এ সঙ্কট স্থানীয় অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কৃষক সুরুজ আলী বলেন, ধান, সবজি ও কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও খরচ হয়। অনেক সময় মাথায় মাল বহন করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়।
সামাজিক জীবনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গোলনগর গ্রামের সোলায়মান মিয়ার ভাষ্য, সেতু না থাকায় বাইরের অনেক পরিবার এ এলাকার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয় না। ফলে সামাজিকভাবেও মানুষ নানা সঙ্কটে পড়ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনে বহু মানুষ সাঁকো পার হতে গিয়ে আহত হয়েছেন; কেউ হাত-পা ভেঙেছেন, কেউ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্বও বরণ করেছেন। তবু বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সেতু নির্মাণ হলে শুধু যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নই হবে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দুই ইউনিয়নের মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি সৃষ্টি হবে।
এ বিষয়ে সোনারগাঁও উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন চৌধুরী জানান, ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর সেতু নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন মিললে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন একটাই, তিন যুগের অপেক্ষা আর কত দীর্ঘ হবে? তাদের দাবি, আশ্বাস নয়, এবার বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটানোই এখন সময়ের দাবি।



