কূটনৈতিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত চাপ প্রয়োগের কৌশল নিয়েছে ভারত। প্রতিবেশী দেশটি বাংলাদেশের আপত্তির মুখে এক দিকে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত সেমিনার অনুষ্ঠানে বাধা দিয়েছে। অন্য দিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হিন্দুস্তান টাইমসকে স্পর্শকাতর ইস্যুতে সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে গঙ্গা চুক্তি নবায়ন বা নতুন চুক্তি সই করার ক্ষেত্রে বিহারের তোলা আপত্তিগুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য দ্বিপক্ষীয় সফরের পাশাপাশি আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেয়ার পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যাবেন। নতুন সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী এবারই প্রথম ইউএনজিএর অধিবেশনে যোগ দিবেন। এই অধিবেশনের উচ্চ পর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক চলবে ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দিতে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু এই আউটরিচ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর যোগ দেয়ার সম্ভাবনা নেই বলে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ ভারতের সাথে আলোচনা সঠিক পথে চললেও অক্টোবরের আগে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর হচ্ছে না। তবে গঙ্গা চুক্তিসহ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক থেকে রাজনৈতিক দিক নির্দেশনা প্রয়োজন বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের ওপর ভারত নিয়ন্ত্রিত চাপ প্রয়োগ করছে কিনা- জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, হতে পারে। শেখ হাসিনা যাতে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে না পারে, সে জন্য বাংলাদেশ সরকার থেকে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে ভারতের কাছ থেকে কোনো প্রতিশ্রুতি আমরা পাইনি। তবে এ ধরনের ইস্যুতে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক থেকে নির্দেশনা না এলে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে না এবং সেটার প্রতিফলন পাওয়া যাচ্ছে।
মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পথে থাকা গঙ্গা চুক্তিকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে কারিগরি পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে এক্ষেত্রেও শীর্ষ পর্যায়ের দিক নির্দেশনা ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না বলে আমার ধারণা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত পৌঁছানো না গেলে দুই পক্ষের সম্মতিতে মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে অথবা আলোচনা ঝুলে যেতে পারে।
ভারতের সাথে বাংলাদেশের অপরাপর অগ্রাধিকার ইস্যুগুলোর ওপর আলোকপাত করে হুমায়ুন কবির বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাংলাদেশের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা ভারত বন্ধ করে দিয়েছিল, যা এখনো চালু হয়নি। প্রতিবেশী দেশ হিসাবে পারস্পরিক নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। শেখ হাসিনাসহ অন্যদের প্রত্যর্পণের ইস্যু তো রয়েছেই। এ ছাড়া তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বাংলাদেশের অগ্রাধিকার। ভারতের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশে নেয়া প্রকল্পগুলো গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই মুখ থুবরে পড়েছে। দুই দেশের স্বার্থেই এ প্রকল্পগুলো আবারো চালু করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা না আসছে, ততক্ষণ এ সব ইস্যু সুরাহার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কেননা রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ সব ইস্যুতে হাত দেবে না। সব স্থবির হয়ে থাকবে।
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরের প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা সঠিকভাবে চললে অক্টোবরে সফরটি হতে পারে। সব দিক থেকেই এই সফরটা হওয়া খুবই জরুরি। সময় যত যাচ্ছে, আমরা বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছি। গঙ্গা চুক্তি যথাসময়ে নবায়ন না হলে বা নতুন চুক্তি না হলে উজানের দেশ হিসেবে ক্ষতিটা ভারতের হবে না, হবে ভাটির দেশ বাংলাদেশের। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা না বুঝে জেদাজেদি করতে গিয়ে আমরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হই। এক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধিকে কাজ করতে দিতে হবে। যথাসময়ে দ্বিপক্ষীয় সফর না হওয়ায় দিল্লিতে আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেয়াও প্রধানমন্ত্রীর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্ব নেতাদের সাথে মতবিনিময়ের একটি সুযোগ সৃষ্টি হতো, যা নতুন সরকারের জন্য ইতিবাচক হতে পারত।
দিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে গত ২৯ আগস্ট ‘ইউরোপ এবং এশিয়া : সংলাপ থেকে অংশীদারিত্ব’ বিষয়ক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এই অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদসহ অন্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শেষ মুহূর্তে দিল্লি পুলিশের আপত্তির কারণে এবং অনুমতি না দেয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। এর আগে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দিল্লিতে একই ক্লাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ অন্যদের প্রত্যর্পণ এবং ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শহিদ ওসমান হাদি হত্যাকারীদের হস্তান্তরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পূর্বশর্ত হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সর্বশেষ ২৯ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের অনুষ্ঠানটি বাতিল হওয়ার ঘটনাটিকে বাংলাদেশ সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। ওসমান হাদি হত্যাকারীদের বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি ভারত সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
এ দিকে গত ২ সেপ্টেম্বর হিন্দুস্তান টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার সময়সীমা, আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানের প্রস্তুতি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ভারত সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের সাথে গোপন আলোচনা বা সমঝোতা ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারতের স্বার্থ রক্ষায় আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ভূমিকা রেখেছিল। এ কারণে ভারতের বৃহত রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে এক ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। আর তাই ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পক্ষপাতি নয়। হিন্দুস্তান টাইমসকে দেয়া সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে এটাই প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং ক্ষমতাসীন বিজেপির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতো রয়েছে। এই সবকিছুর সমন্বয় করেই বাংলাদেশের ওপর নিয়ন্ত্রিত চাপ বজায় রাখতে চাইছে ভারত।



