- প্রযুক্তির আবরণে ঢাকা পড়ছে দুর্নীতি
- ৮১.৫ শতাংশ সেবাগ্রহীতার দাবি ঘুষ ছাড়া সেবা মেলে না
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা আনতে গত দেড় দশকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশে’র নামে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও হতাশাজনক। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ খানা বা পরিবার কোনো না কোনো সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। ভূমি, পাসপোর্ট, এনবিআর ও ব্যাংকিং খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো ডিজিটাল করার পর সাধারণ মানুষের শারীরিক যাতায়াত কিছুটা কমলেও, পর্দার আড়ালে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী এক ‘ডিজিটাল সিন্ডিকেট’।
টিআইবি ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ দশমিক দুই কোটি টাকা, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে পাসপোর্ট সেবায় দুর্নীতির হার সবচেয়ে বেশি ৮৬ শতাংশ, এরপরেই রয়েছে বিআরটিএ ৮৫ দশমিক দুই শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৭৪ দশমিক পাঁচ শতাংশ এবং ভূমি সেবা ৬৬ দশমিক দুই শতাংশ।
ভূমি সেবা ‘ডিজিটাল’ দালালের নতুন জাল : ভূমি সেবা বর্তমানে ডিজিটালাইজেশনের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হলেও এখানে দুর্নীতির চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। টিআইবির ২০২৫ সালের জরিপ বলছে, ভূমি সেবায় দুর্নীতির হার ৬৬ দশমিক দুই শতাংশ এবং এ খাতে বছরে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ৮১ কোটি টাকা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ই-মিউটেশন বা ডিজিটাল খতিয়ান চালু হলেও সাধারণ মানুষ নিজে তা সম্পন্ন করতে পারছেন না। সার্ভার সমস্যার অজুহাত দিয়ে কর্মকর্তাদের একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে কাজ বিলম্বিত করে। ফলে সাধারণ মানুষ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) বা দালালের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়।
অনুসন্ধানে আরো দেখা গেছে, আগে দালালেরা ভূমি অফিসের বারান্দায় ঘুরঘুর করত, এখন তারা ‘ডিজিটাল এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন করার পর ‘স্পিড মানি’ বা ঘুষ না দিলে সেই ফাইল মাসের পর মাস ঝুলে থাকে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ই-সেবা কেন্দ্রগুলোই দালালের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যেখানে তারা কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সাধারণ নাগরিকের বদলে নিজেরা অনলাইন আবেদন প্রসেস করে এবং ঘুষের টাকা ভাগাভাগি করে। বাধ্যতামূলক দালাল নির্ভরতা ইউডিসি বা অনলাইন পোর্টালের চেয়ে মানুষ এখনো দালালের ওপর বেশি নির্ভরশীল কারণ ৯৫ শতাংশ আবেদন এখনো প্রথাগত কাগজনির্ভর পদ্ধতি ও দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রসেস হচ্ছে।
পাসপোর্ট ঘুষই যেখানে ‘ডিজিটাল ফি’ : পাসপোর্ট সেবাকে এখনো দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে ৮৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা দুর্নীতির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। যদিও ই-পাসপোর্ট ও অনলাইন ফি জমা দেয়ার ব্যবস্থা চালু হয়েছে, কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেয়ার ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়। অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্ধতিগত ভোগান্তি পাসপোর্ট সেবা গ্রহণে দরিদ্র পরিবারগুলোর মোট মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশ ব্যয় করতে হয়, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশই খরচ হয় ঘুষ বাবদ। কাল্পনিক ভুল ও রিজেকশন ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ নিজে আবেদন করলে সার্ভার জটিলতা বা আঙুলের ছাপে অমিল দেখানো হয়। কিন্তু দালাল বা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আবেদন করলে এই একই ত্রুটিগুলো আর ধরা পড়ে না
এনবিআর অটোমেশনে নাজুক দশা : জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আয়কর রিটার্ন জমা দেয়ার কাজ অটোমেশন করলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান নিজেই দুইবার অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন এবং এর কারণ হিসেবে অটোমেশনের দুর্বলতা ও বায়োমেট্রিক জটিলতাকে দায়ী করেছেন। দেশের এক কোটির বেশি টিআইএন ধারীর মধ্যে মাত্র চার লাখ মানুষ অনলাইনে রিটার্ন দেন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, অনলাইন সিস্টেমটি ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল রাখা হয়েছে যাতে করদাতারা আইনজীবীদের বা ‘অফিসিয়াল সিন্ডিকেটের’ সাহায্য নিতে বাধ্য হন।
ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি : ব্যাংকিং খাতে ডিজিটালাইজেশন বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কথা বললেও এখানে গড়ে উঠেছে ভয়াবহ সাইবার জালিয়াতি চক্র। মাত্র এক সপ্তাহে একটি বেসরকারি ব্যাংকের ৫৪ জন গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড থেকে ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ব্যাংকিং খাতের ডিজিটালাইজেশন সাধারণ মানুষের জীবন সহজ করলেও, বড় আকারের লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করেছে সিন্ডিকেটগুলো। এস আলমের মতো প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো সাতটি ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা ব্যাংকিং সিন্ডিকেটের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞদের মত : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি দফতরগুলো সেবা সম্পূর্ণ ডিজিটাল না করে একটি ‘হাইব্রিড পদ্ধতি’ (ম্যানুয়াল ও ডিজিটাল মেশানো) জিইয়ে রেখেছে, যা নতুন সিন্ডিকেট তৈরিতে সাহায্য করছে। বাংলাদেশের সরকারি সেবায় প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও মানসিকতা ও জবাবদিহিতার পরিবর্তন না হওয়ায় একটি শক্তিশালী ‘ডিজিটাল সিন্ডিকেট’ সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। আইসিটি বিভাগের পেছনে ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ই-গভর্নমেন্ট সূচকে বাংলাদেশ ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১০০তম অবস্থানে রয়েছে, যা ভারত বা শ্রীলঙ্কার চেয়েও নিচে।
নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানিয়ে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার নিজের জমি খারিজ করতে গিয়ে অরিজিনাল রেকর্ড থেকে সংশোধন করতে হলে কুমিল্লা অফিস থেকে সিল মেরে আনতে হবে জানিয়ে সরাসরি ২০ হাজার টাকা দাবি করে বসে। মূলত জমির মিউটেশন করতে সব মিলে সরকারি ফি এক হাজার ১৭০ টাকা প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ধাপে টাকা দিতে হয়। এটি কোনো সরকারের নিয়ম নয়, বরং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ব্যবস্থা। অফিসের ভেতরে কর্মকর্তাদের সাথে দালালের নিজস্ব ‘লিঙ্ক’ বা পরিচিতির সম্পর্ক থাকে। দালালের মাধ্যমে আবেদন গেলে কর্মকর্তারা দ্রুত কাজ করে দেন কারণ সেখানে কমিশনের ব্যাপার থাকে। কিন্তু সাধারণ মানুষ নিজে গিয়ে ফাইল খুঁজলে বা আবেদন করলে তারা পাত্তাই দেয় না, ফলে বাধ্য হয়ে দালালেরই দ্বারস্থ হতে হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক সেবা খাত প্রযুক্তিনির্ভর বা ডিজিটাল হলেও এর আড়ালে পুরনো সিন্ডিকেট, ঘুষ প্রথা এবং দালাল চক্র এখনো শক্তিশালীভাবে টিকে আছে। এর প্রধান কারণ এই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাগুলো পরিকল্পিতভাবেই রেখে দেয়া হয়েছে; এগুলো দূর করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। বিগত সরকারের আমলে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তেমন কিছুই বদলায়নি। বরং দুর্নীতি এখন আমাদের প্রশাসনিক ও কাঠামোগত ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে এবং এটি বর্তমানে একটি ‘নীতি’ বা স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে।



