নিজস্ব প্রতিবেদক
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৭৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল রোববার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ গত বছরের ২০ নভেম্বর এই যুগান্তকারী রায়টি ঘোষণা করেছিলেন। রোববার আনুষ্ঠানিকভাবে সেই রায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলো।
প্রকাশিত রায়ে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রযোজ্য হবে না; বরং চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। তবে রায়ের আইনি ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কার্যকর থাকা সংসদ চাইলে সময়ের প্রয়োজনে এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্যবস্থায় কিছু সংযোজন কিংবা বিয়োজন করতে পারবে। রায়ের অনুলিপি প্রকাশের পর আইন অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে এবং এটিকে দেশের গণতন্ত্র রক্ষার পথে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজলসহ অন্য আইনজীবীরা এটিকে কোনো নির্দিষ্ট দলের বিজয় হিসেবে না দেখে পুরো জাতির অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। শুনানির সময় তারা অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক যে রায় দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছিলেন, তা ছিল মূলত রাজনৈতিক ফায়দা লোটার একটি কৌশল এবং সেই রায়ের মাধ্যমেই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ধ্বংস করা হয়েছিল। আইনজীবীদের মতে, আজকের এই পূর্ণাঙ্গ রায় সেই কলঙ্কজনক অধ্যায় মুছে ফেলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের আইনি সুরক্ষা প্রদান করল।
এই ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর, ২০১১ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। সেই রায়ের পথ ধরেই পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলোপ ঘটে, যা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় সংস্কারের অংশ হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২০১১ সালের রায়টি পুনর্বিবেচনার জন্য পৃথক পৃথক রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়। দীর্ঘ শুনানির পর আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সেই রায়কে অবৈধ ঘোষণা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়দানকারী আপিল বিভাগের এই বেঞ্চে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সাথে ছিলেন বিচারপতি মো: আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো: রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। রায়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় বিচারকরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা ও সাংবিধানিক বৈধতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। রায়ের কপি প্রকাশের পর এখন সংশ্লিষ্ট মহলে শুরু হয়েছে এর বাস্তবায়নের আইনি প্রক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের নানামুখী বিশ্লেষণ।
জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরম্যাট
গত ১৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের দেয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ১৬ ধারায় নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে এবং ৫৮(খ), ৫৮(গ), ৫৮(ঘ) ও ৫৮(ঙ) অনুচ্ছেদ হিসেবে নতুন করে যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে সনদে। সংসদের মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা অন্য যে-কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ (নব্বই) দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
ফরম্যাট সম্পর্কে বলা হয়, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৫ দিন আগে এবং অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ে একটি বাছাই কমিটি রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে এই কমিটি গঠিত হবে। জাতীয় সংসদের স্পিকারের তত্ত্বাবধানে এবং সংসদ সচিবালয়ের ব্যবস্থাপনায় এটি গঠিত হবে। কমিটি গঠনের ১৪ দিনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা পদের জন্য ব্যক্তি বাছাই করতে হবে।
কমিটির সদস্য সংখ্যা হবে পাঁচজন। এতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) ও সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। কমিটির যেকোনো বৈঠক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় সভাপতিত্ব করবেন স্পিকার। উপদেষ্টাদের বয়সসীমা ৭৫ বছরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
সনদে আরো বলা হয়েছে, এই পদ্ধতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বেছে নেয়া সম্ভব না হলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও শর্ত দেয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বেছে নেয়া যাবে না। যদিও প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা হওয়ার যোগ্যতা ধরা হয়েছে ত্রয়োদশ সংশোধনীর ৫৮গ অনুচ্ছেদ অনুসারে। তবে জুলাই সনদের ৩ ধারা বা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংক্রান্ত ৫৮ক, ২ক পরিচ্ছেদ (৫৮খ, ৫৮গ, ৫৮ঘ ও ৫৮ঙ অনুচ্ছেদ) সংবিধানে যুক্ত হবে, তা সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজনে হবে। জুলাই সনদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফরম্যাট।
বয়স বিবেচনাতেই জামিন পান খায়রুল হক : হাইকোর্ট
একই দিন হাইকোর্টের ওয়েবসাইটে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে চার মামলায় জামিনের পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে বয়স বিবেচনায় ৮১ বছর বয়সী সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে চার মামলায় জামিন দেয়া হয়। তবে জামিনের শর্ত ভাঙলে খায়রুল হকের জামিন বাতিল করতে পারবে সিএমএম কোর্ট। বিচারপতি মো: খায়রুল আলম ও বিচারপতি মো: সগীর হোসেনের দ্বৈত বেঞ্চ এ জামিনের রায় প্রকাশ করেন। তবে অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন থাকায় আপাতত মুক্তি পাচ্ছেন না খায়রুল হক।
এর আগে গত ৮ মার্চ জুলাই আন্দোলনের সময় যুবদল কর্মী হত্যা ছাড়াও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রায় জালিয়াতির চার মামলায় সাবেক এই প্রধান বিচারপতিকে জামিন দেন হাইকোর্ট। ওই দিন তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারিকৃত রুল যথাযথ ঘোষণা করে হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
পরে ১২ মার্চ ঢাকার একটি আদালতে তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়। এ বিষয়ে আগামী ৩০ মার্চ শুনানি হতে পারে। এর ফলে চার মামলায় জামিন পেলেও আপাতত মুক্তি পাচ্ছেন না তিনি।
গত বছরের ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডির বাসা থেকে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তাকে জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে যুবদল কর্মী আবদুল কাইয়ুম আহাদ হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়
পরবর্তীতে সাবেক এই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এ মামলা ছাড়াও আরো চারটি মামলা হয়। এর মধ্যে গত বছরের ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত একটি রায় জালিয়াতির অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
তারও আগে ২৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আরেকটি মামলা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারী ভুঁইয়া। একই অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় ২৫ আগস্ট আরেকটি মামলা করেন জনৈক নুরুল ইসলাম মোল্লা। এ ছাড়া গত বছরের ৪ আগস্ট প্লট জালিয়াতিতে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকও সাবেক এই প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। গত রোববার এ মামলায়ও তাকে জামিন দেন আদালত।
এসব মামলায় নি¤œ আদালতে জামিন নামঞ্জুরের পর তিনি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। পরে হাইকোর্ট পাঁচ মামলায় জামিন প্রশ্নে রুল জারি করেন। সবশেষ গত ৮ মার্চ জুলাই পাঁচটি মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে জামিন দেন হাইকোর্ট।



