ভূগর্ভস্থ পানির চাপ কমাতে বরেন্দ্রে নতুন সেচ কৌশল

ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার, ডাবল লিফটিং ও পানি সংরক্ষণে জোর বিএমডিএর

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাটের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকায় এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীবিকা ও জনজীবনে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করেও আগের মতো সহজে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কম বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং নদ-নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

Printed Edition
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো: হাসান জাফির তুহিন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় করেন   :  নয়া দিগন্ত
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো: হাসান জাফির তুহিন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে স্থানীয়দের সাথে মতবিনিময় করেন : নয়া দিগন্ত

মুহা: আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে পানির ভবিষ্যতের ওপর। দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং কৃষিতে সেচের ওপর বাড়তি নির্ভরতায় এ অঞ্চলে পানির সঙ্কট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানি তুলে কৃষি উৎপাদন সচল রাখা হলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা নিয়ে এখন নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও জয়পুরহাটের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র এলাকায় এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, জীবিকা ও জনজীবনে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করেও আগের মতো সহজে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কম বৃষ্টিপাত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন এবং নদ-নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো, নদী-খাল ও জলাশয়কে সেচের আওতায় আনা, ডাবল লিফটিং প্রকল্পের মাধ্যমে দূরের পানির উৎস থেকে কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দেয়া, পানির অপচয় কমানো এবং আধুনিক সেচপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেয়া হচ্ছে।

শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, বিদ্যমান সেচ প্রকল্পগুলো কতটা কার্যকরভাবে চলছে এবং সেগুলোর সুফল প্রকৃতপক্ষে কৃষকের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ জন্য মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সঙ্কট নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে সেচনির্ভর কৃষিতে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অনিয়মিত ও কম বৃষ্টিপাত। বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়া এবং শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘায়িত হওয়ায় কৃষিতে সেচের প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে একদিকে বাড়ছে পানির চাহিদা, অন্য দিকে কমছে সহজলভ্য পানির উৎস।

ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, জলাশয় ও খালের পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া এবং প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর সঙ্কোচনও বরেন্দ্রের পানি পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে। এর প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকার ওপরও পড়ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের চার হাজার ৯১১টি মৌজাকে পানিসঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রাথমিকভাবে ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৫০৩টি মৌজাকে অতি উচ্চ পানিসঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও পরবর্তী চূড়ান্ত গেজেটে এ সংখ্যা দাঁড়ায় এক হাজার ৪৬৯টি। একই গেজেটে ৮৮৪টি মৌজাকে উচ্চ এবং এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে মধ্যম মাত্রার পানিসঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

পরবর্তী সময়ে এসব এলাকাকে ১০ বছরের জন্য পানিসঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে গেজেট জারি করা হয়। একই সাথে সঙ্কটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে বিধিনিষেধের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে মাঠপর্যায়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে বিকল্প পানির উৎস ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গোদাগাড়ীর কৃষক জালাল উদ্দীন বলেন, বিএমডিএর সেচসুবিধার কারণে তাদের এলাকায় কৃষিকাজ অনেক সহজ হয়েছে। সময়মতো পানি পাওয়া গেলে আমন, বোরোসহ বিভিন্ন ফসল ভালোভাবে আবাদ করা সম্ভব হয়। তবে সেচসুবিধা নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের কৃষক শামিম আহম্মেদ বলেন, পানির সঙ্কটের কারণে বরেন্দ্র এলাকার কৃষকদের সব সময় চিন্তায় থাকতে হয়। সেচ প্রকল্পগুলো ঠিকভাবে চালু থাকলে উৎপাদন বাড়ে এবং খরচও কমে। নদী ও খালের পানি ব্যবহার করে সেচসুবিধা আরো বাড়ানোর প্রত্যাশা করেন তিনি।

স্থানীয় কৃষক শাহাজাহান মিয়া বলেন, বিএমডিএর সেচসুবিধা তাদের মতো কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পানি পাওয়া গেলে জমি অনাবাদি থাকে না। নতুন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন হলে আরো অনেক কৃষক উপকৃত হবেন।

বিএমডিএর চেয়ারম্যান (সচিব পদমর্যাদা) কৃষিবিদ মো: হাসান জাফির তুহিন বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন টেকসই রাখতে পানির সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সেচব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পানির অপচয় রোধ করতে হবে।

তার এই নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেচ অবকাঠামোর উন্নয়ন, খাল ও জলাশয়ের কার্যকর ব্যবহার এবং পানি সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

পরিকল্পনা ও প্রকল্পের কাগজপত্রের বাইরে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাইয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বিএমডিএ। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন প্রকল্প সরজমিনে পরিদর্শন করেন বিএমডিএর চেয়ারম্যান কৃষিবিদ মো: হাসান জাফির তুহিন।

তিনি রাজশাহীর গোদাগাড়ী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন খাল, কৃষিজমি, বিএমডিএর ডাবল লিফটিং সেচ প্রকল্প, পুনর্ভবা নদীতে স্থাপিত সেচ প্রকল্প এবং মহানন্দা নদীর প্রস্তাবিত ডাবল লিফটিং প্রকল্পের ইনটেক পয়েন্ট পরিদর্শন করেন।

পরিদর্শনকালে স্থানীয় কৃষক ও নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলে তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা শোনেন তিনি। মাঠের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।

পরিদর্শন শেষে গোমস্তাপুর জোন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ রিজিয়ন অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথেও মতবিনিময় করেন চেয়ারম্যান। এ সময় প্রকল্পের অগ্রগতি, সেচ ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের সমস্যা এবং কৃষকদের সেবা দিতে গিয়ে কর্মকর্তাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। মাঠপর্যায়ের সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান এবং কৃষকের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের আরো দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালক মো: জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে।

বরেন্দ্রের কৃষক এখন শুধু একটি সেচ প্রকল্প চান না। তারা চান প্রয়োজনের সময় নিশ্চিত পানি, নির্ভরযোগ্য সেবা, কম খরচ এবং স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সেচ ব্যবস্থাপনা। একই সাথে তারা চান এমন পানি ব্যবস্থাপনা, যা আজকের কৃষিকে সচল রাখার পাশাপাশি আগামী প্রজন্মের পানির নিরাপত্তাও নিশ্চিত করবে।

সেই বাস্তবতায় বরেন্দ্রের কৃষিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ‘কোথা থেকে পানি আসবে’- তা নয়; বরং ‘কিভাবে পানি ধরে রাখা যাবে, কিভাবে সাশ্রয় করা যাবে এবং কিভাবে দীর্ঘমেয়াদে পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।’