মেগা প্রকল্পে মেগা-ধীরগতি বাস্তবতা না বুঝেই নকশা!

সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর

দেশের সব মেগা প্রকল্প একই রোগাক্রান্ত। অন্যতম মেগা অবকাঠামো ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মেগা-ধীরগতি। বিদেশী ঋণে ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা খরচের এই মেগা প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন সাত বছর আগের এক ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বেড়াজালে বন্দী। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশাগত ত্রুটি, ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় অতিক্রম হলেও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং অর্থ ব্যয় হয়েছে ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ।

হামিদুল ইসলাম সরকার
Printed Edition

  • প্রকল্পটি ৭ বছর আগের ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বেড়াজালে বন্দী
  • মেয়াদ ৬ মাস হাতে, কাজ বাকি ৭৮.৯৫ শতাংশ
  • প্রকল্পে ৬ ধরনের পরামর্শকে খরচ ৩৫৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা

দেশের সব মেগা প্রকল্প একই রোগাক্রান্ত। অন্যতম মেগা অবকাঠামো ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মেগা-ধীরগতি। বিদেশী ঋণে ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা খরচের এই মেগা প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন সাত বছর আগের এক ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বেড়াজালে বন্দী। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশাগত ত্রুটি, ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় অতিক্রম হলেও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং অর্থ ব্যয় হয়েছে ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পটির ওপর ইএসিআর সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। আর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় ধরনের পরামর্শকের পেছনে খরচ হবে ৩৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রায় ২৪৭ কোটি ৬২ লাখ ২১ হাজার ৭৩.১২ টাকার তিনটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম রয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, রাজধানী ঢাকা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও নির্বিঘœভাবে পরিচালনার সুবিধা সৃষ্টি করা, মহাসড়কের উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় যানবাহন ও ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাসেক করিডোর, বিমসটেক করিডোর ও সার্ক করিডোরের সাথে সংযোগ জোরদার করে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বয়স্ক, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের (ঊডঈউ) জন্য উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ মহাসড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়কজনিত ঝুঁকি কমিয়ে আনা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বও পর্যন্ত ছয় বছরে প্রকল্পটি সমাপ্ত করা। এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ রয়েছে ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের জোগান দেয়ার কথা।

প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমগুলো

প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, ঢাকা (কাঁচপুর) থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯.৩২৮ কিলোমিটার দুই লেন-বিশিষ্ট মহাসড়ক (এন-২) চার লেনে উন্নীতকরণ, চার লেন-বিশিষ্ট মহাসড়কের উভয় পাশে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য ৫.৫ মিটার প্রস্থে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ, ৬৬টি সেতু নির্মাণ, ৩০৫টি কালভার্ট নির্মাণ, সাতটি ফ্লাইওভার বা ওভারপাস নির্মাণ, ছয়টি রেলওভার ব্রিজ, ৩৭টি ইউটার্ন, আটটি রাউন্ড এবাউট এবং ১০. ২৬টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ।

পুরনো নকশার ভুল ও মাঠপর্যায়ের ধাক্কা

মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার তথ্যে দেখা গেছে, সাত বছর আগে সম্পাদিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সাথে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই এমন নকশা দিয়ে প্রকল্পটি শুরু করা হয়। নকশা প্রণয়নের সময় প্রকল্প এলাকার ভূপ্রকৃতি ও মাটির নিচের গভীর বৈশিষ্ট্য (ঝঁন-ংড়রষ) সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে কাজ শুরু করতে গিয়ে সড়ক এলাইনমেন্টে ক্ষতিকর স্লাজ ও অর্গানিক সয়েলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এখন নতুন করে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, অতিরিক্ত সাব-সয়েল টেস্ট ও গ্রাউন্ড ইম্প্রুভমেন্টের কাজ করতে গিয়ে মূল নির্মাণকাজের গতি পুরোপুরি শ্লথ হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সময় কৃষিজমি হিসেবে থাকা অনেক জমি এখন বাণিজ্যিক বা আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে জমির মালিকরা সরকারের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ মানতে রাজি হচ্ছেন না এবং আদালতের আশ্রয় নিচ্ছেন।

‘ওয়ার্কিং উইন্ডো’ বা কর্মপরিসরের তীব্র সঙ্কট

আইএমইডি বলছে, নির্মাণ ঠিকাদারদের কাজ করার জন্য যে ন্যূনতম ফাঁকা জায়গা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এর প্রধান কারণগুলো হলো : এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ (৩১৯.১৫ একর)। জমির বাস্তব শ্রেণী পরিবর্তন হওয়ায় মালিকপক্ষের আপত্তি ও আইনি মামলার কারণে চূড়ান্ত জমি হস্তান্তর আটকে আছে। তিতাস গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি মাত্র ০.৭৮ শতাংশ, জালালাবাদ গ্যাসের ১৫.৬৮ শতাংশ এবং বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি ৪৬.২০ শতাংশ। আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতার কারণে এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।

প্রকল্প ৬ ধরনের পরামর্শকে ভারাক্রান্ত

৫.৫ বছরে অগ্রগতি ও কাজের মান নিয়ে উদ্বেগ

পর্যবেক্ষক সংস্থা ইএসিআর সার্ভিস বলছে, প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে চার লেনের মহাসড়ক, উভয় পাশে সার্ভিস লেন, ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও ফুটওভার ব্রিজ। অথচ সাড়ে পাঁচ বছরে মূল সড়কের অগ্রগতি মাত্র ১১.৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬.৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১.১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮.৭৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। এ দিকে বেশির ভাগ নির্মাণসামগ্রীর মান ঠিক থাকলেও কিছু সেকশনে রিজিড পেভমেন্টের কনক্রিটের সঙ্কোচন শক্তি নির্ধারিত নকশা মানদণ্ডের নিচে পাওয়া গেছে; যা মহাসড়কের স্থায়িত্বের জন্য বড় হুমকি।

মাঠপর্যায়ের চিত্র

ইএসিআর সার্ভিসের সরেজমিনের তথ্য বলছে, নির্মাণাধীন সড়কে তীব্র যানজট ও ধুলোবালুর কারণে স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী পরিধানে অনীহা এবং পর্যাপ্ত সেফটি ব্যারিয়ার বা সাইনেজের অভাবে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও আর্থিক অনিয়ম

প্রকল্পের ধীরগতির জন্য দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও দায়ী। এডিবির গাইডলাইন অনুসারে দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই তিন থেকে সাড়ে ছয় মাস অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয়েছে। এমনকি দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি সম্পাদনে ১১ থেকে ১৯ মাস পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। এ ছাড়া ঠিকাদারদের আর্থিক তারল্য সঙ্কট ও দুর্বল সাইট ব্যবস্থাপনাও দৃশ্যমান। আর প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বড় দুর্বলতা। প্রকল্পের অধীনে উত্থাপিত ১৯টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১৫টিই এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রায় ২৪৭ কোটি ৬২ লাখ ২১ হাজার ৭৩.১২ টাকার তিনটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম রয়েছে।

পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইএসিআর সার্ভিসের মতামত

পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইএসিআর সার্ভিসের প্রকল্পটি সম্পর্কে বলছে, ছয় বছরের প্রকল্প, সাড়ে পাঁচ বছরে অগ্রগতি সামগ্রিকভাবে আশাব্যঞ্জক নয়। প্রকল্প মেয়াদের ৮৯ শতাংশ সময় অতিক্রান্ত হলেও ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ, পাশাপাশি বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরে ৪৬.২০ শতাংশ, তিতাস গ্যাসের ০.৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাসের ১৫.৬৮ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এই ধীরগতির কারণে ঠিকাদারদের পর্যাপ্ত ‘ওয়ার্কিং উইন্ডো’ প্রদান করা সম্ভব হয়নি; যা এই মেগা প্রকল্পের কাক্সিক্ষত গতি অর্জনের মূল অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া সাত বছর আগে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্যতা বড় দায়ী। পাশাপাশি ক্ষতিকর কাদা ও ভারবহনে অনুপযুক্ত মাটির (ঝষঁফমব ্ ঙৎমধহরপ ঝড়রষ) উপস্থিতি, নকশাগত জটিলতা, এডিবির গাইডলাইন অনুযায়ী দরপত্র প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক তারল্য সঙ্কট ও দুর্বল সাইট ম্যানেজমেন্টও প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত করার ক্ষেত্রে সমানভাবে দায়ী।

মেগা প্রকল্পে ধীর গতি

প্রকল্পের ব্যাপারে জানার জন্য প্রকল্প পরিচালক এ কে মোহাম্মদ ফজুলল করিমের সাথে গতকাল তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, জমি অধিগ্রহণ একটা বড় ধরনের জটিলতার বিষয়। জমি অধিগ্রহণের কারণেই প্রকল্পটি এতটা বিলম্বিত হয়। সরকার পরিবর্তনের পর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়ায় প্রকল্পটি এখন নতুন করে গতি ফিরে পেয়েছে। কারণ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ দ্রুতই শেষ হবে। তিনি বলেন, যে সময় আছে তাতে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। তাই সময় বাড়ানোর প্রয়োজন। সাত বছর আগের সমীক্ষায় কী সমস্যা ছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রকল্প এলাকায় অনেক পরিমাণ জমি অধিগ্রহণই বেশি জটিলতা দেখা দেয়।