আলজাজিরা ও আরব নিউজ
ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে বেআইনি আখ্যা দিয়ে হরমুজ প্রণালীতে সামরিক বাহিনী না পাঠানোর দাবিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় সাধারণ মানুষ বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। গতকাল সিউলস্থ মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে ‘আগ্রাসী যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকুন’ সংবলিত ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে নাগরিকরা একত্রিত হন। চলমান উত্তেজনায় ওয়াশিংটনকে সহায়তা করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত চাপ দিয়ে আসলেও প্রতিবাদকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তারা তাদের দেশের যুবসমাজকে যুদ্ধের ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে চান না।
হরমুজ এলাকার সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে একটি তদন্ত দল পাঠানোর ঘোষণার পরদিনই দেশের ভেতরে এমন গণপ্রতিবাদের মুখোমুখি হয় সরকার। অবশ্য সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে সিউলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে গত শুক্রবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যাঘাত না ঘটলে হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কার্যক্রমে সামরিক সহযোগিতা দেওয়ার পথ খোলা রয়েছে। অন্য দিকে তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে, সিউল সেনা পাঠালে তা সরাসরি মার্কিন আগ্রাসনের সমর্থন হিসেবে গণ্য হবে এবং এর পরিণতি বেশ মারাত্মক হতে পারে। এ দিকে সঙ্ঘাতপূর্ণ মধ্যপ্রাচ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক নৌযান পারাপার স্বাভাবিক সূচকের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সংগৃহীত ট্র্যাকিং উপাত্ত অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার এই সঙ্কীর্ণ প্রণালী দিয়ে সাকুল্যে ছয়টি পণ্যবাহী জাহাজ পারাপার হয়েছে, যা তার আগের দিন অর্থাৎ গত সোমবার ছিল ৯টি।
কেপলারের তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স জানাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রণালী দিয়ে দৈনিক গড়ে প্রায় ১২টি করে জাহাজ যাওয়া-আসা করছিল। সে হিসাবে গত মঙ্গলবারের সংখ্যাটি স্বাভাবিক পারাপারের অর্ধেকেরও কম। অবশ্য নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা কৌশলগত কারণে অনেক জলযান ট্রান্সপন্ডার সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখায় এই পরিসংখ্যানে পরিবর্তন আসতে পারে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পার হওয়া ছয়টি বাহনের মধ্যে পাঁচটি প্রণালিতে প্রবেশ করেছে এবং একটি প্রস্থান করেছে, যার মধ্যে দু’টি ভিন্ন আকারের ট্যাঙ্কারও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইরান যুদ্ধে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের মুখে সিউল
এদিকে আলজাজিরা জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযানে দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত হলে কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সিউল সামরিক সহায়তার কথা বিবেচনা করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতেই এই হুমকি দেয়া হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই গত পরশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, উপসাগরীয় এলাকা ও হরমুজ প্রণালীতে যেকোনো ধরনের বিদেশী সামরিক উপস্থিতি বা অভিযানে অংশ নেয়াকে ইরান সরাসরি আক্রমণের সমর্থন হিসেবে গণ্য করবে, যা কারো জন্যই মঙ্গলজনক হবে না। তেহরান স্মরণ করিয়ে দেয়, ৬৪ বছরের দীর্ঘ কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সিউলের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের আগ্রাসন ও নারী-শিশুদের ওপর চালিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দক্ষিণ কোরিয়া অংশ নিলে এই ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঘাই আরো উল্লেখ করেন, কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই মার্কিন চাপের কাছে মাথা নত করা উচিত নয়। দক্ষিণ কোরিয়া অবশ্য সরাসরি তেহরানের বক্তব্যের জবাব দেয়নি।
ওয়াশিংটনের ক্রমাগত চাপ
ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর বেশ কিছু দিন ধরেই চাপ সৃষ্টি করে চলেছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মাসে জানান, তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিউংকে ইরানবিরোধী অভিযানে সহায়তার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু সিউল তা প্রত্যাখ্যান করে। এর পরপরই দুই দেশের সামরিক সম্পর্কে অচলাবস্থা তৈরি হয়। উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় প্রতিবছর অনুষ্ঠিত ১১ দিনব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ শুরুর আগের দিন ট্রাম্প এর সময়সীমা কমিয়ে পাঁচ দিনে এনে ঠেকান।



