রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে শক্তিশালী করতে বিধি প্রণয়ন থেকে শুরু করে মামলা দায়ের, ক্ষতিপূরণ আদায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার পর্যন্ত ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন আইনে। তবে স্বচ্ছতা, নাগরিকের অংশগ্রহণ, গণশুনানি ও বিচারিক তদারকি ছাড়া এই ক্ষমতা সাধারণ মানুষের অধিকার সীমিত করে দিতে পারে বলে আশঙ্কাও সৃষ্টি হয়েছে।
এ জন্য নীতিমালা প্রণয়নের আগে ও পরে জনগণের মতামত গ্রহণ, ওয়েবসাইটে সব সিদ্ধান্ত প্রকাশ, স্বাধীন অডিট ও আপিল মেকানিজম গড়ে তোলা- এই আইনের অধিকার ও জবাবদিহি’ ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
প্রস্তাবিত রাজউক অধ্যাদেশের সপ্তম অধ্যায়ের বিধানগুলোতে রাজউককে ক্ষমতায়িত করার এসব প্রস্তাব রয়েছে। এতে (ধারা ৬৮-৮২) মূলত একগুচ্ছ নীতি, ক্ষমতা ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অধ্যায়কে বলা যায়- উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ‘গভর্ন্যান্স ম্যানুয়াল’- যেখানে বিধি, প্রবিধান, মামলা, ক্ষতিপূরণ, জরিপ ও জনসেবকের দায়মুক্তি পর্যন্ত সব কিছু স্পষ্ট করা হয়েছে।
বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারা-৬৮ এ সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, ভূমি উন্নয়ন ও পুনর্বিন্যাস, ভূমি বরাদ্দ, উন্নয়ন স্বত্ব বিনিময়, ইমারত নির্মাণ, চাকরি ও আর্থিক বিধিমালাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।
এ ধারা প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা আনতে পারে। তবে প্রণীত বিধি কতটা জনস্বার্থে প্রণয়ন ও পর্যালোচনা হবে- তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও গণশুনানির উপর।
প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা সংক্রান্ত ধারা ৬৯ অনুসারে কর্তৃপক্ষ সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে জামানত গ্রহণ, কর্মচারীদের ছুটি, তহবিল গঠন সংক্রান্ত নীতিমালা ও প্রবিধান করতে পারবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা- যদি নিয়মিত অডিট ও জনসাধারণের কাছে প্রতিবেদন প্রকাশ বাধ্যতামূলক হয় তা হলে এ ব্যবস্থা অভ্যন্তরীণ আর্থিক শৃঙ্খলা আনার পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও কমাতে পারে।
অধ্যাদেশের ধারা ৭০ এ জনসেবকের মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান, সদস্য ও কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনের সময় দণ্ডবিধির ২১ ধারায় সংজ্ঞায়িত জনসেবক হিসেবে গণ্য হবেন। জনসেবক মর্যাদা দুর্নীতি দমন কমিশন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে সুবিধা দেয়, তবে একই সাথে দায়মুক্তির অপব্যবহারও রোধ করতে হবে।
নোটিশ জারি ও গণমাধ্যম সংক্রান্ত ধারা ৭১ এ নোটিশ প্রদানকে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। বলা হয়েছে- ব্যক্তি উপস্থিত না থাকলে রেজিস্টার্ড ডাক, পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য বা অনলাইন ওয়েবসাইট ও জাতীয় সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি আকারে জারি করা যাবে। বিশ্লেষকদের মতে- এতে স্বচ্ছতা বাড়বে, কিন্তু ওয়েবসাইটে হালনাগাদ নোটিশের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।
অধ্যাদেশের ধারা ৭২ এ মামলা দায়ের, আপস ও আইনি পরামর্শ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই ধারা অনুসারে চেয়ারম্যান কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে মামলা দায়ের, আপস, দাবি মীমাংসা ও আইনগত পরামর্শ নিতে পারবেন। এটি কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দিলেও স্বচ্ছতা ও তদারকির অভাবে ‘আপাতত বলবৎ আইন’ দিয়ে আপসের সুযোগ অপব্যবহার হতে পারে।
অধ্যাদেশের ৭৩ ও ৭৪ নাম্বার ধারায় দায়মুক্তি ও মামলা দায়েরের পূর্ব নোটিশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- সৎ উদ্দেশ্যে (সরল বিশ্বাসে) গৃহীত ব্যবস্থা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না; আবার মামলা করার আগে এক মাসের নোটিশ দিতে হবে। নাগরিকের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের পথে এটি এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলে কেউ কেউ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে ৭৫ ধারায়। অপরাধের তথ্য সাথে সাথে কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে, আর পুলিশ কমিশনার ও এসপি বাধ্য থাকবেন সহযোগিতা করতে। বিশ্লেষকদের মতে- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এতে সহজ হবে, তবে বলপ্রয়োগের ঝুঁকিও থাকতে পারে।
আইন স্পষ্টভাবে কিছু না বললেও যুক্তিসঙ্গত ক্ষতিপূরণ দেয়ার ক্ষমতা রাখা হয়েছে ধারা ৭৭ এ। বলা হয়েছে- কর্তৃপক্ষের সম্পদ বিনষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ আদায় ও অনুমোদনহীন স্থাপনা অপসারণের খরচ মালিকের কাছ থেকে নেয়া যাবে।
ভূমি অধিগ্রহণ বা জরিপজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রে নাগরিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিতের সুযোগ আছে। তবে ‘বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের দাবি করা যাবে না’ এই শর্তটি নাগরিকের সুরক্ষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে মর্মে আশঙ্কাও রয়েছে।
জরিপ ও প্রবেশাধিকারের বিধান রয়েছে ধারা ৭৯ ও ৮০ এ। এ ধারা অনুসারে কর্তৃপক্ষ জরিপ করাতে পারবে; চেয়ারম্যান বা নিযুক্ত ব্যক্তি ২৪ ঘণ্টা আগে নোটিশ দিয়ে দিনের বেলায় ভূমিতে প্রবেশ করতে পারবে। ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই ধারা উন্নয়ন প্রকল্পের নির্ভুল তথ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু স্থানীয় জনগণকে আগে থেকে অন্তর্ভুক্ত করলে বিরোধ এড়ানো যাবে।
অধ্যাদেশে ধারা ৮১ এ দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ারবহির্ভূত বিষয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে- এই আইনের অধীনে গৃহীত কোনো কার্য বা নির্দেশের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য ভালো হলেও নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সঙ্কীর্ণ করে। আপিল বা পুনর্বিবেচনার স্পষ্ট বিকল্প দরকার।
সরকারি দাবি অনুসারে বকেয়া আদায়ের কথা বলা হয়েছে ধারা ৮২ এ। ক্ষতিপূরণ বা বকেয়া অর্থ সরকারি দাবি হিসেবে ১৯১৩ সালের পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি আইন অনুযায়ী আদায় করা যাবে। এতে অর্থ আদায়ে ক্ষমতা বাড়বে, কিন্তু দুর্নীতি বা হয়রানি ঠেকাতে পর্যবেক্ষণ হবে জরুরি।
সপ্তম অধ্যায় মূলত প্রশাসনিক কাঠামো, নীতি ও প্রক্রিয়াকে স্পষ্ট করে। সরকারের বিধি প্রণয়ন ও কর্তৃপক্ষের প্রবিধান প্রণয়ন- দুই স্তরের মধ্যে একদিকে নীতি নিয়ন্ত্রণ, অন্য দিকে কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতা তৈরি করে। নোটিশ, ক্ষতিপূরণ, পুলিশের সহযোগিতা, জরিপ, প্রবেশাধিকার ইত্যাদি বিধান মাঠপর্যায়ে কাজকে সহজ করবে। তবে দায়মুক্তি, দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার বাদ দেয়া এবং মামলা দায়েরের আগে বাধ্যতামূলক নোটিশ- এগুলো নাগরিক অধিকার ও প্রতিকারপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করার ঝুঁকি রাখে।
আইনটির এই অধ্যায় কার্যকর হলে ভূমি ও উন্নয়নসংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়তে পারে। একই সাথে, দুর্নীতি বা অপব্যবহার রোধে তদারকি ও স্বাধীন আপিল ব্যবস্থারও প্রয়োজন রয়েছে- যা আইনের কাঠামোকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করবে।



