বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ২ লাখ ৪৩ হাজার কৃষক

সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি খাতে। বন্যায় আট হাজার ৮৩৬ দশমিক ১৩ হেক্টর শাকসবজির জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ৮৭ হাজার ৯৬৭ মেট্রিক টন। এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেক। শুধু শাকসবজি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ২৬৩ জন কৃষক।

কাওসার আজম
Printed Edition
  • কৃষিতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকা
  • ৪৩ জেলায় ২৪ হাজার হেক্টরের বেশি ফসল নষ্ট
  • সবচেয়ে বেশি ক্ষতি আউশ ও শাকসবজিতে

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চলতি মাসে ৪৩ জেলার কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) চূড়ান্ত হিসাব বলছে, গত ৬ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত বন্যায় ২৪ হাজার ১৩৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ মেট্রিক টন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৭৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬০ জন কৃষক।

চলতি জুলাইয়ে টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে নি¤œাঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে যায়। ঠিক এমন সময় আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা এবং মৌসুমি শাকসবজির আবাদ মাঠে থাকায় কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও ক্ষতির চিত্র এখন স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে শাকসবজি খাতে। বন্যায় আট হাজার ৮৩৬ দশমিক ১৩ হেক্টর শাকসবজির জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন কমতে পারে প্রায় ৮৭ হাজার ৯৬৭ মেট্রিক টন। এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৩১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যা মোট ক্ষতির প্রায় অর্ধেক। শুধু শাকসবজি খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ২৬৩ জন কৃষক।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে আউশ ধানে। বন্যায় ১২ হাজার ৭৮৩ দশমিক ৭০ হেক্টর আউশের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৩৬ হাজার ২৬৬ মেট্রিক টন উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ খাতে আর্থিক ক্ষতি ১৭১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৪৩৯ জন।

এ ছাড়া রোপা আমনের বীজতলার ১ হাজার ৭৪৬ দশমিক ১৩ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৯৪৯ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষতি এবং ১৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৫ হাজার ৯২৭ জন কৃষক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীজতলার এই ক্ষতি সময়মতো পুনর্বাসন করা না গেলে আগামী আমন মৌসুমের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। মসলা ও অর্থকরী ফসলের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। আদায় ১২৪ দশমিক ৮৬ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ১ হাজার ৬১৮ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ খাতে আর্থিক ক্ষতি ২২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। মরিচের ১১৫ দশমিক ২৪ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ১ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষতি এবং ৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। হলুদে ৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা এবং পানে ৮ কোটি ২২ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।

ফলবাগানও বন্যার আঘাত থেকে রেহাই পায়নি। ১৪৩ দশমিক ৭৫ হেক্টর ফলবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ২ হাজার ৫৪৯ মেট্রিক টন উৎপাদন হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এ খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই মাসে আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা ও মৌসুমি সবজি সবচেয়ে স্পর্শকাতর অবস্থায় থাকে। এ সময় বন্যার কারণে এসব ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শুধু চলতি মৌসুম নয়, আগামী আমন উৎপাদনের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সহায়তা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, জামালপুর, শেরপুর, নওগাঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন, বীজ ও সার সহায়তা এবং রোপা আমনের চাষে জরুরি প্রণোদনা দেয়া না হলে আসন্ন মৌসুমে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এজন্য দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির ভিত্তিতে সহায়তা কার্যক্রম শুরু করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।