নিজস্ব প্রতিবেদক
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কারো বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল হলে তিনি আর বাংলাদেশের কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি, তিনি কোনো সরকারি চাকরিতেও যোগ দিতে পারবেন না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এ সাম্প্রতিক সংশোধনের মাধ্যমে এসব বিধান যুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই সংশোধনের মূল বিষয় হলো যদি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল হয়, তবে তিনি বাংলাদেশের কোনো জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্য হবেন না। পাশাপাশি তিনি আর কোনো সরকারি চাকরিতেও নিয়োগ পেতে পারবেন না।’ তিনি আরো বলেন, এই সংশোধনের ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরপরই তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও সরকারি চাকরির সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
আইনে এটি একটি নতুন সংযোজন উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম বলেন, একটা রাষ্ট্র বিপ্লবোত্তর পরিবেশে যখন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে, তখন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকার এই আইন শুধু নয়, বরং বিভিন্ন আইনের বিভিন্ন ধরনের সংশোধনী আনছে রাষ্ট্রকে সঠিক পথে তোলার জন্য। এখন থেকে আইন প্রযোজ্য হবে বলেও জানান তিনি।
ইতোমধ্যে ফরমাল চার্জ দাখিল হয়ে ক্ষমতাচ্যুত পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অনেক সরকারি কর্মকর্তা-পুলিশের বিচার চলছে। এ ছাড়া জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে। এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ওই সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ একটি সেকশন যুক্ত করা হয়েছে। নতুন সংযোজিত ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উক্ত আইনের সেকশন-৯ এর -১এর অধীনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল হলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বা বহাল থাকার অযোগ্য হবেন।
শফিকুল আলম আরো বলেন, একইভাবে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্থানীয় সরকার পরিষদ বা প্রতিষ্ঠানের সদস্য, কমিশনার, চেয়ারম্যান, মেয়র বা প্রশাসক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া বা বহাল থাকার অযোগ্য হবেন। এমনকি প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া বা অন্য কোনো পাবলিক অফিসে অধিষ্ঠিত হওয়ারও অযোগ্য হবেন।
দল হিসেবে আ’লীগের বিচার কাজের আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু : এ ছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের বিচারের ব্যাপারে আবেদন আগেরই ছিল। যেহেতু সব আবেদন এক সাথে নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিল না। তাই ক্রমান্বয়ে এসব করা হচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ তদন্ত শুরু হয়েছে। এ ছাড়া আদালতে সাক্ষীদের দেয়া বিভিন্ন জবানবন্দী এ ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক দলিল হিসেবে কাজ করবে। সাক্ষ্যগুলো অন্যতম প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে।
এ সপ্তাহে বেশ কিছু ঘটনা ঘটবে বলা হয়েছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা বলেছি আরো বেশ কয়েকটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হবে। এ সপ্তাহের মধ্যেই হবে আশা করছি। দল হিসেবে সাজা প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, দলকে তো আর সাজা দেয়া যাবে না। কিন্তু দলকে কী ধরনের সাজা দেয়া যাবে সেটা কিন্তু আইনে বলা আছে। যেমন দলকে নিষিদ্ধ করা বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় সাজা দেয়া বা তাদের নেতাকর্মীর ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা ইস্যু করা- এসব আইনে রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ব্যাপারেই তদন্ত শুরু হয়েছে। যেসব দল জড়িত ছিল তাদের ব্যাপারেও তদন্ত হওয়া দরকার, তা হলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে তদন্ত সংস্থা। এর আগে গত বছরের ২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন এনডিএম-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। এতে বলা হয়, গণহত্যার সরাসরি হুকুমদাতা হিসেবে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ১৪ দলীয় জোটকেও দায়ী করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তদন্তের পরই নেয়া হবে বিচারের ব্যবস্থা।



