গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা

চব্বিশের জুলাই পূর্ববর্তী ধারায় ফিরবে রাষ্ট্র?

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ নিয়ে নতুন জটিলতায় পড়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। সরকারি আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত এমপিদের একই সাথে সংসদ সদস্য ও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কথা থাকলেও বিরোধী জোটের ৭৭ জন সদস্য দু’টি শপথ নিলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ২১২ জন সদস্য সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। বিধি অনুসারে তাদের হাতে এক মাস সময় থাকলেও এই সময়ের মধ্যে শপথ নেবেন- এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে গণভোটে পাওয়া জনসমর্থন এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন- দু’টিই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ নামে যে গেজেট প্রকাশ করেছে, তা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, সনদে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং সেই রায়ের ভিত্তিতেই বাস্তবায়নের পথ নির্ধারিত হবে। ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের পে মত দিয়েছেন।

গণভোটে যেসব প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত ছিল, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, দ্বিকবিশিষ্ট সংসদ, উচ্চকে ১০০ সদস্যের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, নারীর আসন বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ। এসব বিষয়ে জনসমর্থন মিললেও আইনি বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সংসদের ওপর।

সরকার ও অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব ঘোষণা দিয়েছে-গণভোটে ‘হ্যাঁ’ রায় এলে নির্বাচিত সংসদ একটি সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন করবে, যা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশোধনীগুলো বাস্তবায়ন করবে। উচ্চকও বিশেষ সাংবিধানিক ধারায় গঠিত হবে।

তবে আইনি বাস্তবতা বলছে, গণভোট নিজে থেকে আইন নয়। এটি কেবল অনুমোদন দেয়; কার্যকারিতা দেয় সংসদ। সংবিধান সংশোধন কিংবা নতুন কাঠামো কার্যকর করতে হলে আইন প্রণয়ন এবং সংসদীয় অনুমোদন অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রমতার প্রয়োগের কেন্দ্র হলো জাতীয় সংসদ ভবন। ফলে সংসদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো মৌলিক সংস্কার কার্যকর হতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো প্রক্রিয়ায় তিনটি আইনি স্তর রয়েছে। প্রথমত, জুলাই সনদ- এটি একটি নীতিগত বা নৈতিক দলিল; সরাসরি বলবৎযোগ্য আইন নয়। দ্বিতীয়ত, গণভোট- এটি জনমতের অনুমোদন, কিন্তু স্বয়ংক্রিয় সংশোধন নয়। তৃতীয়ত, সংসদীয় আইন- এটাই বাধ্যতামূলক ও কার্যকর। এই শেষ ধাপ ছাড়া আগের দু’টি আদালতে প্রয়োগযোগ্য নয়।

বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপি যদি সংস্কার পরিষদে অংশ না নেয়, তাহলে দু’টি ঝুঁকি তৈরি হয়। এক, সংশোধনীগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। দুই, ভবিষ্যতে আদালতে প্রক্রিয়াগত অযৌক্তিকতা বা ঐকমত্যের অভাবের যুক্তিতে চ্যালেঞ্জ উঠতে পারে। উপরন্তু, ভবিষ্যৎ সংসদ চাইলে এসব আইন বাতিল বা সংশোধনও করতে পারবে। ফলে সংস্কারের স্থায়িত্ব নড়বড়ে হয়ে পড়বে।

আইনের ভাষায় বলা যায়- জুলাই সনদ হলো ঘোষণামূলক দলিল; গণভোট হলো অনুমোদন প্রক্রিয়া; সংসদীয় আইন হলো কার্যকর বাধ্যবাধকতা। শেষ ধাপটি অনুপস্থিত থাকলে আগের দুটির শক্তি অপূর্ণ থেকে যায়। তাই বিএনপির অনুপস্থিতিতে সংস্কার কার্যকর করা সম্ভব হলেও তা হবে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে- আইনত বৈধ, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে ভঙ্গুর।

অনেক আইনজ্ঞের মতে, সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়া ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫’-এর ধারা লঙ্ঘনের শামিল। আদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে-সংসদ সদস্যদের যিনি শপথ পড়াবেন, সংস্কার পরিষদের সদস্যদেরও তিনিই শপথ পড়াবেন। এতে অস্পষ্টতার সুযোগ নেই। এই অনাগ্রহকে কেউ কেউ জনমতের প্রতি অশ্রদ্ধা বলেও মন্তব্য করছেন।

মূলত জুলাই সনদ, গণভোট এবং সংসদীয় অংশগ্রহণ- এই তিনটি একই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার তিন স্তম্ভ। সনদ দেয় আন্দোলনের নৈতিক বৈধতা, গণভোট দেয় জনমতের বৈধতা, আর সংসদ দেয় প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি বৈধতা। একটির ঘাটতি পুরো কাঠামোকে অসম্পূর্ণ করে।

শুধু আন্দোলন থাকলে তা আবেগে সীমাবদ্ধ থাকে। শুধু গণভোট থাকলে তা সংখ্যায় সীমাবদ্ধ হয়। আর শুধু সংসদ থাকলে জন-আকাক্সা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিনটির সমন্বয়েই পরিবর্তন টেকসই হয়।

এই প্রোপটে বৃহৎ দলীয় অংশগ্রহণ ছাড়া সংস্কারপ্রক্রিয়া এগোলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে- আইন পাস হচ্ছে, কিন্তু আস্থা তৈরি হচ্ছে না; সিদ্ধান্ত আসছে, কিন্তু স্থিতি আসছে না। দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থাতেও অনিশ্চয়তা বাড়বে। ফলে প্রশ্নটি কেবল দলীয় কৌশলের নয়; রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের। অংশগ্রহণ মানে দায় ভাগ করে নেয়া। বাইরে থেকে সমালোচনা সহজ, কিন্তু ভেতরে থেকে সমাধান কঠিন- তবু প্রয়োজনীয়। বৃহৎ দল এতে অংশ না নিলে রাষ্ট্রের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিণে। সম্মিলিত ঐকমত্যে স্থিতিশীল সংস্কারের পথে হাঁটবে, নাকি বিভক্ত বৈধতার ভারে আবারো অনিশ্চয়তার চক্রে ঘুরবে তা নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দায়িত্ববোধই। সময়ই বলে দেবে, আমরা সমঝোতার রাজনীতি বেছে নেবো, নাকি অবিশ্বাসের।