সিলেট-ছাতক রেলপথ পুনর্বাসনে অনিশ্চয়তা মেয়াদ শেষেও কাজ ২০ শতাংশ

২০২৫ সালে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়

Printed Edition

আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট

সিলেট-ছাতক রেলপথ পুনর্বাসন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও কাজ হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। ফলে ৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথে কবে ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। প্রকল্পের ধীরগতিতে হতাশ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে কাজ ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হয়নি। তারা আরো এক বছর সময় চেয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের বন্যায় সিলেট-ছাতক রেলপথের বিভিন্ন অংশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর পর থেকে প্রায় চার বছর ধরে এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ। দীর্ঘদিন রেলযোগাযোগ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের স্লিপার ও লোহার পাত চুরির ঘটনাও ঘটেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত রেলপথ পুনর্বাসনে বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ‘২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের (মিটারগেজ ট্র্যাক) পুনর্বাসন প্রকল্প’ নেয়া হয়। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় প্রায় ৩৪ কিলোমিটার রেলপথ পুনর্বাসনে ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ ৪ হাজার ৩৬৯ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের (এমএএইচএল) সাথে ওই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি চুক্তি হয়। প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ২১৭ কোটি টাকা হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির পরিমাণ ১৯৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং রেললাইন বসানোর কাজ চলছে। ছাতক থেকে সিলেট পর্যন্ত পুরনো রেললাইনও প্রায় ৩৪ কিলোমিটার অপসারণ করা হয়েছে। তবে গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর, ছৈলা-আফজলাবাদ, সৎপুর এবং বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চিসহ কয়েকটি এলাকায় কাজ বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। নতুন ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই কাজ ধীরগতিতে চলছে। বন্যার পর রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সড়কের সাথে সমন্বয় নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা জানান।

গোবিন্দগঞ্জের বাসিন্দা সুমন তালুকদার বলেন, সংস্কারকাজ শুরু হলে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়ে মানুষের মধ্যে আশার সৃষ্টি হয়েছিল। শুরুতে বিভিন্ন স্থানে কাজ হলেও পরে কিছু এলাকায় তা বন্ধ হয়ে যায়। কাজ বন্ধ থাকার কারণ সম্পর্কে স্থানীয়দের স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।

ছাতক প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রনি বলেন, রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় ছাতকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পণ্য পরিবহনে এ রেলপথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। দ্রুত কাজ শেষ করে রেল যোগাযোগ চালুর দাবি জানান তিনি।

ছাতক পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী আবুল হাসান বলেন, সিমেন্ট, চুনাপাথর, বালু ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেলপথটি গুরুত্বপূর্ণ। রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সড়কপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে।

প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। মাটি ভরাট ও কালভার্টের কাজ চলছে। তার দাবি, প্রকল্পের প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২৩ আগস্ট শেষ হয়েছে। মেয়াদ বাড়ানো ও পরবর্তী কার্যক্রম বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প প্রকৌশলী সজিবুর রহমান বলেন, ৫১ হাজার স্লিপার তৈরির কাজ চলছে। মাটি ভরাট, কালভার্ট ও স্টেশন নির্মাণের কাজও চলমান। আগামী মাসে ১০টি কালভার্টের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, বৃষ্টি ও বর্ষার কারণে মাটির কাজ সময়মতো করা যায়নি। দেড় বছর মেয়াদি প্রকল্পের মধ্যে দু’টি বর্ষাকাল পড়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন মালামাল আমদানিতেও সমস্যা হয়েছে। প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করতে আরো এক বছর সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সময় পেলে আগামী এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।